নতুন বাস্তবতায় সৌদি-মার্কিন সম্পর্ক

চিররঞ্জন সরকার
২১ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:৩২
শেয়ার :
নতুন বাস্তবতায় সৌদি-মার্কিন সম্পর্ক

মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক মানচিত্রে যেন নতুন রেখাচিত্র আঁকা হচ্ছে- এমন এক মুহূর্তে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ওয়াশিংটন সফর বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ২০১৮ সালের পর প্রথমবার হোয়াইট হাউস সফর করতে চলেছেন এমবিএস, এমন এক সময়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্ক বহু বছরের টানাপড়েন পেরিয়ে এক নতুন বাস্তবতা ও স্বার্থের সমীকরণে প্রবেশ করছে। গাজায় আগুন জ্বলছে, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা চরমে এবং চীন-রাশিয়ার আগ্রাসী কূটনীতি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে। ঠিক এমন সংকটময় প্রেক্ষাপটে দুই দেশের নেতাদের এই বৈঠক শুধু একটি সফর নয়- বরং এটি হতে পারে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার সূচনা। নতুন প্রতিরক্ষাচুক্তি, পারমাণবিক সমঝোতা, উন্নত অস্ত্র বিক্রি এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডে সম্ভাব্য অগ্রগতি- সব মিলিয়ে এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট।

এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে- যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের নতুন কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি, সৌদির ‘প্রধান নন-ন্যাটো মিত্র’ (মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই) মর্যাদা পাওয়া, বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার চুক্তি, উন্নত অস্ত্র বিক্রি এবং দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’-এ সৌদির সম্ভাব্য অংশগ্রহণ।

যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সৌদির সম্পর্ক সব সময়ই বিশেষভাবে ঘনিষ্ঠ ছিল, তবে এই সফরকে ভিন্ন মাত্রায় মূল্যায়ন করা হচ্ছে, কারণ চলমান গাজা যুদ্ধ, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ- সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য এক নতুন মোড় নিচ্ছে।

হোয়াইট হাউস সফরের অংশ হিসেবেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাটোর বাইরে প্রধান মিত্র’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সাধারণত এই মর্যাদা যুক্তরাষ্ট্র এমন দেশগুলোকেই দেয় যাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা সুগভীর এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো যখন দুই দেশ একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবং সৌদি আরবের সরকারি সূত্র উভয়ই বলছে, এই চুক্তি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে দুই দেশের ‘যৌথ প্রতিশ্রুতি’ আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করবে।

হোয়াইট হাউসের বিবৃতি অনুসারে, নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামোতে উন্নত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, সামরিক প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়ার প্রসার এবং বিশেষ করে ইরানের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় সমন্বিত নিরাপত্তা স্থাপত্য তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই একটি শান্তিপূর্ণ বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে আগ্রহী হলেও সব সময়ই শর্ত ছিল- এ কর্মসূচি যেন কোনোভাবেই অস্ত্র তৈরির পথে না যায়। এই সফরে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ‘বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি’ নিয়ে একটি যৌথ ঘোষণা অনুমোদন করেছে, যা আগামী কয়েক দশক ধরে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আইনি ভিত্তি তৈরি করবে।

যদিও সৌদি আরবের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার রাখার দাবি ছিল, যুক্তরাষ্ট্র তা এখনও খোলামেলাভাবে সমর্থন করেনি। তবে নতুন চুক্তিকে অনেকে দেখছেন ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি রিয়াদের প্রযুক্তিগত আকাক্সক্ষার কাছাকাছি যাওয়ার কূটনৈতিক সমাধান হিসেবে। পরমাণু সহযোগিতার শর্তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সবকিছুই ‘অস্ত্র বিস্তার রোধের আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে’ পরিচালিত হবে।

সফরে আরও একটি বড় ঘোষণা এসেছে- এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানসহ উন্নত সামরিক প্যাকেজ বিক্রিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি। দীর্ঘদিনের দাবি থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন কৌশলগত কারণে ওয়াশিংটন এতদিন সৌদিকে এফ-৩৫ দিতে অনীহা দেখিয়েছিল। কিন্তু ইসরায়েলের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক জোটবিন্যাস এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডে সৌদির সম্ভাব্য অংশগ্রহণ- সব মিলিয়ে এই সিদ্ধান্ত এখন নতুন আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। অনেকে বলছেন, ওয়াশিংটন আসলে সৌদির সঙ্গে ব্যাপক নিরাপত্তা জোট করে ইসরায়েল-আরব সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের আরও বড় লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছে।

২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন করলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি হয়। সুদান ও মরক্কোও এতে যুক্ত হয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় ও প্রতীকী গুরুত্বের দেশ সৌদি আরব তখনও দ্বিরাষ্ট্র সমাধান ছাড়া কোনো চুক্তিতে যেতে রাজি হয়নি।

এমবিএস নিজে বহুবার বলেছেন, ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ‘দ্বিরাষ্ট্র সমাধান’ না হলে সৌদি আরব আব্রাহাম অ্যাকর্ডে যুক্ত হবে না। গাজায় চলমান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এই অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। তবে সিবিএসের সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে, সৌদি আরব আব্রাহাম অ্যাকর্ডে যোগ দিতে ‘প্রস্তুত’ এবং একটি ‘সমাধান’ আসছে- যদিও সেটা দ্বিরাষ্ট্র সমাধান হবে কিনা তা নিশ্চিত নয়।

ট্রাম্পের কথা থেকে মনে হয়, তিনি বিশ্বাস করেন- মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিচুক্তির অগ্রগতির পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শক্তির ভারসাম্য, নিরাপত্তা আস্থা এবং সৌদির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিশ্চয়তা। গাজায় যুদ্ধবিরতি থাকলেও ইসরায়েল প্রতিদিনই বোমাবর্ষণ করছে- একটি জটিল ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি। এমন অবস্থায় সৌদির জন্য আব্রাহাম অ্যাকর্ডে সই করা নৈতিক, রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক নেতৃত্বের দিক থেকে অত্যন্ত কঠিন। আরববিশ্বের নেতৃত্ব দাবি করতে হলে সৌদিকে ফিলিস্তিনের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে অবস্থান বজায় রাখতে হয়।

তাই অনেকে মনে করেন, সৌদি আরব হয়তো প্রকাশ্যে নয়, বরং ধীরে ধীরে, পরোক্ষ বা বহুস্তরীয় কূটনৈতিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের পথ খুঁজবে। ওয়াশিংটন সফর হয়তো সেই পথচলার সূচনা। সৌদি-মার্কিন কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা বাড়ার একটি বড় কারণ ইরান। সৌদি আরব ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেও দুই দেশের মধ্যে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে। ফলে সৌদি-মার্কিন প্রতিরক্ষা চুক্তিকে অনেকে দেখছেন ‘ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তাবেষ্টনী’ গড়ার কৌশল হিসেবে।

অন্যদিকে ইসরায়েল এখনও রাজনৈতিক সংকটে এবং গাজার যুদ্ধ দেশটির আন্তর্জাতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল সৌদির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনকে ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।

তুরস্ক, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত- এদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। সৌদি-মার্কিন জোট শক্তিশালী হলে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন চাপ সৃষ্টি হবে। তুরস্ক এই অঞ্চলে প্রভাব বাড়াতে চায়, আমিরাত প্রযুক্তি ও বাণিজ্যে এগোতে চায়, আর কাতার কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চায়।

এমবিএস ‘ভিশন ২০৩০’-এর আওতায় সৌদি অর্থনীতিকে তেলের ওপর নির্ভরতা থেকে সরিয়ে বহুমাত্রিক শিল্পে রূপান্তর করতে চান। এই বৃহৎ রূপান্তরের জন্য দরকার নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, স্থিতিশীল আঞ্চলিক পরিবেশ, পশ্চিমা বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তাই এমবিএসের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন এজেন্ডার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ট্রাম্প প্রশাসন এখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব পুনর্গঠনে মনোযোগ দিচ্ছে। অঞ্চলটি থেকে মার্কিন মনোযোগ সরে যাওয়ার ফলে চীন, রাশিয়া ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো প্রভাব বাড়িয়েছে। সৌদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জোট মানে চীনের কৌশলগত প্রভাব নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, ইরানকে সীমায় রাখা, ইসরায়েলের নিরাপত্তা বজায় রাখা, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি সুসংহত করা।

সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের এই ওয়াশিংটন সফর স্পষ্ট করে দিচ্ছে- মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আর আগের নিয়মে চলছে না। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, সৌদির উচ্চাভিলাষী ভিশন ২০৩০, ইরানের ছায়া, ইসরায়েলের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে আরব জনমতের চাপ- এসবকে একসঙ্গে ধরে রাখতে এখন এক ধরনের সাহসী ভারসাম্য রচনা করতে হচ্ছে রিয়াদকে। নতুন প্রতিরক্ষা জোট ও পারমাণবিক সহযোগিতা নিঃসন্দেহে সৌদি-মার্কিন সম্পর্ককে শক্ত ভিত দেবে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে সৌদি আরব আব্রাহাম অ্যাকর্ডে যুক্ত হবে কিনা এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে কতদূর পর্যন্ত তাদের নীতি আপসহীন থাকবে।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সৌদিকে আঞ্চলিক নেতৃত্বে দেখতে চায়, অন্যদিকে সৌদি চাইছে এমন এক নিরাপত্তাকাঠামো, যা তাদের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে সুরক্ষা দেবে। এই স্বার্থের মিলনবিন্দুই এখন দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো- এই নতুন কৌশলগত বন্ধন কি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও ভারসাম্য আনবে, নাকি এটি আরেকটি আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিতমাত্র?

যাই হোক, একটি বিষয় নিশ্চিত- এমবিএসের ওয়াশিংটন সফরের পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি আর আগের অবস্থানে ফিরে যাবে না।

চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক

মতামত লেখকের নিজস্ব