পর্যালোচনা ছাড়া বন্দরচুক্তি অগ্রহণযোগ্য -মোশাহিদা সুলতানা

সাক্ষাৎকার

রণজিৎ সরকার
২০ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:৫১
শেয়ার :
পর্যালোচনা ছাড়া বন্দরচুক্তি অগ্রহণযোগ্য -মোশাহিদা সুলতানা

ড. মোশাহিদা সুলতানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া টার্মিনাল চুক্তি নিয়ে সাম্প্রতিক চুক্তি কেন, কীভাবে এবং কার স্বার্থে হলো- তা নিয়ে আমাদের সময়ের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- রণজিৎ সরকার

আমাদের সময় : বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকার ছিল সংস্কার, নির্বাচন ও বিচার- এ অবস্থায় বন্দর চুক্তি কতটা যৌক্তিক?

মোশাহিদা সুলতানা : এই মুহূর্তে বন্দর চুক্তি তড়িঘড়ি করে করার প্রয়োজন ছিল না। সরকারের মূল কাজ ছিল নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক সংস্কার সম্পন্ন করা। এমন দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত চুক্তি সরকারের এখতিয়ারবহির্ভূত। যেই সরকারকে গণতান্ত্রিক রূপান্তরে সংস্কারের পথ সুগমের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেই সরকার যখন নিজেই অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিস্তৃত আলোচনা, পর্যালোচনা ছাড়া, সংসদীয় অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে এমন একটি চুক্তি সম্পাদন করে, তখন কার স্বার্থে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয় তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ থাকবেই।

আমাদের সময় : দেশের বন্দর পরিচালনায় এখনই দুটি নতুন টার্মিনাল- লালদিয়া ও পানগাঁও চুক্তির প্রয়োজন কেন দেখা দিল?

মোশাহিদা সুলতানা : সরকার তো সক্ষমতা বৃদ্ধির অজুহাত দিচ্ছে। দেখুন, যখন আপনি একটি কাজ করবেন তখন তো তার পেছনে নিজ সুবিধামতো যুক্তি খুঁজবেনই। কিন্তু এই সক্ষমতা তৈরি অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না তা যাচাই করবে কে? এটা যাচাই করার জন্য তো প্রয়োজন ছিল সংসদে আলোচনার জন্য তোলা। এর সুবিধা-অসুবিধা পর্যালোচনা করা। জাতীয় স্বার্থ ও বিদেশি বিনিয়োগকারীর স্বার্থ সংঘাতের মধ্যে দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না তা যাচাই করা। কেউ তো সক্ষমতা তৈরিতে বাধা দিচ্ছে না। কিন্তু সেটা কার সক্ষমতা এবং কীভাবে? আমরা আগে-পরে সব সময়ই বলছি জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা। সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে তো আমাদের বিরোধ নেই। বিরোধিতা হচ্ছে চারটি প্রশ্ন ঘিরে- ১। কী প্রক্রিয়ায় সক্ষমতা অর্জন হবে? ২। এই সক্ষমতা বৃদ্ধির নাম করে আমরা কোনো ভূরাজনৈতিক খেলার ঘুঁটিতে পরিণত হব কিনা ৩। কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারীর কাছে জিম্মি হব কিনা ৪। চুক্তির শর্ত না জেনেবুঝে তড়িঘড়ি করে জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত নেব কিনা। এই মুহূর্তে চুক্তি গোপন রেখে যারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তাদের জনগণ এই দায়িত্ব দেয়নি। তারা কথায় কথায় বলে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর বানিয়ে ফেলবে। নতুন টার্মিনালের চুক্তির ক্ষেত্রে যা সবচেয়ে উদ্বেগজনক- নভেম্বরের ৪ তারিখে প্রস্তাব, ১৬ তারিখে প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন এবং ১৭ তারিখে চুক্তি- এই দ্রুততায় আর্থিক বা কারিগরি মূল্যায়নের জন্য যথার্থ সুযোগই রাখা হয়নি। ৩০ বছরের চুক্তি (যা আরও ১৫ বছর বাড়ানো সম্ভব) এভাবে তড়িঘড়ি করা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ।

আমাদের সময় : বাংলাদেশ নিজেরাই বন্দর পরিচালনা করতে সক্ষম; তাহলে বিদেশি কোম্পানির হাতে অপারেশন হস্তান্তর কেন?

মোশাহিদা সুলতানা : চট্টগ্রাম বন্দর ও স্থানীয় ব্যবসায়ী মহল- উভয়েরই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে। বাংলাদেশ নিজেই এই বিনিয়োগ করে সক্ষমতা বাড়াতে পারত। নিউমুরিং টার্মিনালের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা ট্যারিফ বাড়ার পর আপত্তি জানিয়েছিল। এবারও কিছু কিছু ব্যবসায়ী তড়িঘড়ি করে চুক্তি করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বন্দর শ্রমিক ইউনিয়ন ও কিছু রাজনৈতিক দল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এ ধরনের চুক্তিতে যখন স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হয়- চুক্তির মূল উদ্দেশ্য কি প্রকৃত উন্নয়ন নাকি অন্য কিছু! অনেকে বলছে বিদেশিদের কাছে দিলে দুর্নীতিমুক্ত হবে। দুর্নীতিমুক্ত হওয়াকে সক্ষমতার সমার্থক হিসেবে হাজির করছে। আমি বলছি দুর্নীতি ঢাকতেও বিদেশিদের কাছে দেওয়ার দরকার হতে পারে। এখন দুর্নীতি হয়তো আপনি দেখছেন, তখন হয়তো দুর্নীতির বেনিফিশিয়ারি পরিবর্তন হবে, আপনি জানবেনই না ভেতরে দুর্নীতির মেকানিজম কী। সব দুর্নীতি তো সব সময় দেখা যায় না। যেগুলো দেখা যায় সেগুলোর সমাধান করাটাই তো কাজ হওয়া উচিত। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করা, ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা- এগুলোও কিন্তু সংস্কার। আমি বলব এগুলোই আসল সংস্কার। বিদেশি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দিয়ে যদি দুর্নীতিমুক্ত হতে হয় তাহলে তো গোটা দেশকেই বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে হবে। বাংলাদেশ নামের দেশ রেখে লাভ কী? সে ক্ষেত্রে সংস্কার নিয়ে গণভোট না করে গণভোট হতে পারে একটা প্রশ্ন দিয়ে- আপনারা পুরো দেশ কোন দেশের হাতে তুলে দিতে চান? উত্তরের মধ্যে থাকবে- ক. ভারত খ. চীন, গ. জাপান, ঘ. যুক্তরাষ্ট্র। জনগণ যে কোনো একটিতে টিকচিহ্ন দিয়ে পুরো দেশকে একবারেই দুর্নীতিমুক্ত করে ফেলতে পারে। এতে পরিশ্রম কমে যাবে অনেকের।

আমাদের সময় : আদানির গোপন চুক্তির মতো এখানেও কি একই ঝুঁকি রয়েছে?

মোশাহিদা সুলতানা : অবশ্যই। অতীত অভিজ্ঞতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আদানি-ঝাড়খণ্ড বিদ্যুৎ চুক্তি প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা গেছে দাম নির্ধারণ, পরিবহন ব্যয়, বাতিলের শর্ত- সবকিছুতে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী শর্ত রয়েছে। চুক্তিটি মূলত আদানির স্বার্থ রক্ষা করেছিল। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ কিনছে বেশি দামে, কিন্তু আসলে আদানির কয়লার খরচও বহন করছে, আবার বিদ্যুৎ ভারত থেকে নিয়ে আসার খরচও দিচ্ছে। এক কথায়, আদানির ব্যবসার খরচ, ঝুঁকি সবই যেন বাংলাদেশকে বহন করতে হয় চুক্তিটি ছিল সে রকম। এই নতুন বন্দর চুক্তিও গোপন রাখা হয়েছে। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে এই সন্দেহ স্বাভাবিক।

আমাদের সময় : পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ বলেছে- চুক্তি প্রকাশ করা যাবে না। এ ধরনের গোপনীয়তা কেন?

মোশাহিদা সুলতানা : সরকার বলছে, নিরাপত্তার স্বার্থে প্রকাশ করা যাবে না। যদি তাই হয়, তাহলে সংসদে প্রস্তাব রেখে তর্ক-বিতর্ক পর্যালোচনার বিকল্প তো এখানে তাদের যুক্তিতেই অনুপস্থিত। নাকি চুক্তি এটি গোপন যে, এমনকি সংসদ সদস্যদের দেখাও নিষেধ? গণতান্ত্রিক দেশে পর্যালোচনা ছাড়া এ ধরনের চুক্তি গ্রহণযোগ্য হওয়ারই কথা নয়। যদি কোনো কারণে ভবিষ্যতে চুক্তি বাতিল করতে হয়, তখন বাতিলের শর্ত কী- আমরা তাও জানি না। এখন আমরা জানিই না- বাতিলের শর্ত কী, জরিমানা আছে কী নেই, তারা ব্যর্থ হলে বা বিনিয়োগের শর্ত ভঙ্গ করলে আমাদের সরে যাওয়ার সুযোগ আছে কিনা। অপারেটর সব সময়ই আশানুরূপ কাজ নাও করতে পারে। তারা কোনো কারণে অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে আমরা কী পদক্ষেপ নিতে পারি, সে ক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষের বা এপিএম টার্মিনালসের দায় কী হবে- এগুলো তো মৌলিক প্রশ্ন, আমাদের জানার অধিকার রয়েছে। পুরো জাতিকে অন্ধকারে রেখে এত বড় ঝুঁকি নেওয়া একেবারেই সমীচীন নয়।

আমাদের সময় : অপারেশন দায়িত্ব, ঝুঁকি বণ্টন, আর্থিক লাভ- এগুলোর কাঠামো কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে?

মোশাহিদা সুলতানা : সরকার বলছে, চুক্তি হবে পিপিপি মডেলে-মালিকানা বাংলাদেশের, অপারেশন বিদেশিদের। শুনতে ভালো, কিন্তু আর্থিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। আমাদের বলা হয়েছে- লালদিয়া টার্মিনালে বাংলাদেশ প্রতি কনটেইনারে ২৩ ডলার পাবে। কিন্তু পুরো হ্যান্ডলিং চার্জ কত? আমাদের ভাগ কী ১৫ শতাংশ নাকি আরও কম? পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যেখানে বিদেশি অপারেটর রয়েছে তারা কত শতাংশ দিচ্ছে সরকারকে- এগুলো নিয়ে পর্যালোচনার দরকার রয়েছে। এসব তথ্য ছাড়া লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ অসম্ভব। যে কারণে পুরো বিষয়টি অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে। যারা এতদিন সংসদে উচ্চকক্ষের পক্ষে মতামত দিয়েছেন, যুক্তি দিয়েছেন এতে গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করা হয়েছে, তারাও এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর ছাড়াই যদি মেনে নেন তাহলে আমি বলব, উচ্চকক্ষের পক্ষে দাঁড়িয়ে যেসব নাগরিক কথা বলছেন তাদের মধ্যে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের অভাব রয়েছে। তাদের ওপর আস্থা রাখা যায় না।

আমাদের সময় : মূল্যায়ন কমিটির কাজ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে আপনি কী মনে করেন?

মোশাহিদা সুলতানা : ঠিকই। মূল্যায়ন কমিটিতে যেখানে চারজন থাকার কথা ছিল, সেখানে ছিলেন দুজন। এবং তারা মাত্র একদিনে রিপোর্ট জমা দিয়েছেন। ইতিহাসে এমন ঘটেছে বলে আমার জানা নেই। তাড়াহুড়ার কারণে আগেও বড় ভুল হয়েছে। জাইকার মেট্রোরেল প্রকল্প-চুক্তির শর্ত না বুঝে করায় খরচ তিনগুণ বেড়ে যায়। স্বৈরাচারী সরকারের সময়ে ফ্রান্স থেকে এয়ারবাস কেনার সমঝোতা স্বাক্ষর করার আগে দেখেছি, কয়েকদিনের ব্যবধানে মূল্যায়ন কমিটির রিপোর্টের ফাইন্ডিংস চেঞ্জ হয়ে গেছে। অর্থাৎ নিজেদের সুবিধামতো মূল্যায়ন কমিটি লাভ-ক্ষতি হিসাব করেছে। কর্ণফুলী টানেলের ট্রাফিক হিসাব র‌্যান্ডম পদ্ধতিতে করা হয়েছিল- ফলে যত ট্রাফিক হলে টানেল লাভজনক হবে বলা হয়েছিল তার এক-তৃতীয়াংশও ট্রাফিক বাস্তবে ব্যবহার করে না। এখন লোকসান হচ্ছে। এসবই প্রমাণ করে- যখনই স্বচ্ছতা থাকে না বা কমিশনের বিনিময়ে তাড়াহুড়া করা হয়, তখন দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত লাভ বা কমিশনের সম্ভাবনা থাকে, সেসব ক্ষেত্রেই সাধারণত দ্রুত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। সঠিক মূল্যায়ন হয় না। লালদিয়া টার্মিনালের ক্ষেত্রে দেখলাম দুই সপ্তাহ সময় থাকলেও মাত্র এক দিনে কারিগরি মূল্যায়ন করা হয়েছে। কীভাবে সম্ভব? আবার এখন শোনা যাচ্ছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ না করে চুক্তি করা হয়েছে। অর্থাৎ মূল্যায়ন কমিটি যে ভেটিং করার সুপারিশ করেছিল কিন্তু ভেটিংয়ে কিছু আইনি অসংগতি ছিল, সেগুলো সমাধান না করেই চুক্তি করা হয়েছে। শুনে মনে হচ্ছে, দেশের মানুষকে বোকা বানানোর কৌশল করছে তারা।

আমাদের সময় : শিল্প ও শ্রমিক সংগঠনগুলো কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে?

মোশাহিদা সুলতানা : শ্রমিক সংগঠনগুলো আপত্তি জানিয়েছে- এটা নিশ্চিত। ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ আপত্তি জানিয়েছে। তড়িঘড়ি করা নিয়ে প্রশ্ন করেছে। বামপন্থি রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে তাদের উদ্বেগ জানিয়েছে এবং বিরোধিতা করছে। মূল সমস্যা হলো- চুক্তির আগে কোনো পক্ষকে মতামত জানানোর সুযোগই দেওয়া হয়নি। ফলে এখন চুক্তির পর প্রশ্ন ও প্রতিবাদ বাড়ছে।

আমাদের সময় : সময় না দিয়ে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ কী?

মোশাহিদা সুলতানা : বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেছেন- এটা নাকি ‘ইফিশিয়েন্টলি’ করা হয়েছে। কিন্তু এর আড়ালে ভূরাজনৈতিক স্বার্থ থাকতে পারে। ভূরাজনৈতিক স্বার্থ সব সময় খালি চোখে দেখা যায় না। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বিদ্যমান রয়েছে। কেউ কেউ মনে করে মিয়ানমারে চীনের নিয়ন্ত্রিত কিয়াকফিউ বন্দর রয়েছে, আর এদিকে এপিএম টার্মিনাল দেওয়া হয়েছে ডেনমার্কের কোম্পানিকে। তো এখানে যুক্তরাষ্ট্রের বা ভারতের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ কীভাবে ক্রিয়াশীল? যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া মিলে তৈরি হয়েছে কোয়াড নামে একটি কৌশলগত নিরাপত্তা ফোরাম। এর উদ্দেশ্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এরা সব সময় সরাসরি বন্দরে অপারেটর হিসেবে নিযুক্ত হয়ে কৌশল খাটায় না। তারা বন্দর উন্নয়নকে নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে গণ্য করে। এরা সরাসরি লিজ নেয় না, যেমনটা চীন নিয়েছে মিয়ানমারের কিয়াকফিউ বন্দর, শ্রীলংকার হাম্বানটোটা বন্দর। কাজেই সব সময় অপারেটর কোন দেশের তা দিয়ে ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয় না। যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান বন্ধু রাষ্ট্র। তাদের নিজস্ব সমঝোতা রয়েছে জ্বালানি প্রযুক্তি বিস্তার ও তার বাজার সম্প্রসারণে। এ ছাড়া ভারতের তো আগ্রহ রয়েছেই এই বন্দর ব্যবহারে। সবকিছু মিলে বন্দর একটি কৌশলগত বিষয়, যা দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। তাই বারবার বলতে হচ্ছে এত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে তড়িঘড়ি কখনই যুক্তিসঙ্গত নয়। এ কারণেই পুরো প্রক্রিয়াটি সন্দেহজনক মনে হচ্ছে।

আমাদের সময় : চুক্তিটি দীর্ঘমেয়াদি- এতে ঝুঁকি কতটা?

মোশাহিদা সুলতানা : যে কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে ঝুঁকি থাকতেই পারে। প্রতিদিন অর্থনৈতিক নানান চ্যালেঞ্জ যুক্ত হচ্ছে। পৃথিবীতে দ্রুত প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে। আজকে যা লাভজনক, কালকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা লাভজনক নাও থাকতে পারে। এই চুক্তির ক্ষেত্রে ৩০ বছর- আরও ১৫ বছর বাড়তেই পারে। শর্ত যদি দেশবিরোধী হয়, ভবিষ্যতে আমরা জিম্মি হয়ে যাব। অযথাই খরচ বাড়তে পারে, বন্দর ব্যবহারে আমাদের নিয়ন্ত্রণ হারাতে হতে পারে। অপারেটর এখন লাভ দেখিয়ে পরে লোকসানের কারণ দেখিয়ে ভারতের সঙ্গে কানেকটিভিটিতে বাধ্য করতে পারে। দেশের আমদানি-রপ্তানি তাদের মূল প্রায়োরিটিতে নাও থাকতে পারে। এ ছাড়া খরচ বেড়ে গেলে কী হবে তাও জানা যায়নি। যেমন মেট্রোরেলের খরচ বেড়ে যাওয়ার পেছনেও ছিল চুক্তির অন্যায্য শর্ত- যা সময়মতো পর্যালোচনা করা হয়নি। গোপন চুক্তি হলে শর্তগুলো আদৌ দেশীয় স্বার্থ রক্ষা করবে কি না- তা জানার উপায়ও নেই।

আমাদের সময় : বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে এই চুক্তি কী প্রভাব ফেলতে পারে?

মোশাহিদা সুলতানা : সঠিক তথ্য না থাকায় আমার কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন আশা করবেন না। পত্রিকায় শুধু জানা গেছে- বাংলাদেশ ২৩ ডলার পেতে পারে। কিন্তু পুরো অপারেশনাল খরচ, আয়, ভাগাভাগি- এসব কোনো কিছুই প্রকাশিত হয়নি। এমনকি মূল্যায়ন কমিটি একদিনে রিপোর্ট দিয়েছে- এটিও অস্বাভাবিক। এই কারণে অর্থনীতি ও বাণিজ্যে এর সম্ভাব্য লাভ বা ক্ষতি- সেটা এখনও অন্ধকারে।

আমাদের সময় : জনমনে কৌতূহল- এই চুক্তি কি দেশের স্বার্থবিরোধী?

মোশাহিদা সুলতানা : সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে সচেতন নাগরিক সমাজ- সবাই উদ্বিগ্ন। যখন একটি চুক্তি গোপন রাখা হয় এবং যখন তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তখন সন্দেহ হওয়াটা স্বাভাবিক। ভবিষ্যতে চুক্তি বাতিল করতে গেলে যদি ক্ষতির পরিমাণ বিপুল হয় তাহলে সেটা দেশের স্বার্থবিরোধী হতে পারে।

আমাদের সময় : চুক্তি তো হয়ে গেছে- এখন বাতিলের সম্ভাবনা আছে কি?

মোশাহিদা সুলতানা : তারা সাইনিং মানি হিসেবে ২৫০ কোটি টাকা দিচ্ছে অর্থাৎ আর্থিক লেনদেন যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে চুক্তি বাতিল করার শর্ত আছে কিনা আমি জানি না। তবে রাজনৈতিক দলগুলো যদি জোরালো দাবি তোলে, পুনর্মূল্যায়ন বা বাতিল হয়তো সম্ভব। অসম্ভব বলে তো কিছু নেই। বাতিলের জন্য বাতিল করতে হবে এমন নয়। লাভ-ক্ষতি পর্যালোচনা করার জন্য সময় বাড়ালে আমি কোনো ক্ষতি দেখি না। তবে চুক্তির শর্ত উন্মুক্ত না করে যাই করা হোক, জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না।

আমাদের সময় : সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

মোশাহিদা সুলতানা : ধন্যবাদ।