ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মামদানির বিজয়

এইচ বি রিতা
০৯ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:২৯
শেয়ার :
ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মামদানির বিজয়

দেশের পুঁজিবাদী কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নিউইয়র্ক সিটি ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল উইংয়ের হাতে তার চাবি তুলে দিয়েছে। ডেমোক্রেটিক মনোনীত প্রার্থী ৩৪ বছর বয়সী জোহরান মামদানি সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমো এবং রিপাবলিকান কার্টিস স্লিউয়াকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে সিটির ১১১তম মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। এই বিজয় শুধু একটি রাজনৈতিক জয় নয়, এটি আমেরিকান রাজনীতিতে এক নতুন প্লেবুকের ইঙ্গিত।

মামদানি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মেয়র হবেন। তার ‘রেন্ট ফ্রিজ (ভাড়া নিয়ন্ত্রণ)’, ‘বাস ফ্রি’, শিশুদের জন্য সর্বজনীন শিশু-যত্ন সুবিধা এবং ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি নিউইয়র্কবাসীকে আকৃষ্ট করেছে। বিশেষ করে, নিউইয়র্ক শহরের জীবনযাপনের অবর্ণনীয় অবস্থা, আবাসন সংকট, বাড়িভাড়া বৃদ্ধির কারণে নিম্নবিত্ত মানুষ যখন অসহায় হয়ে পড়েছে, তখন জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক শহরকে সাধারণ মানুষের বসবাসযোগ্য করার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি মানুষের পাল্স বুঝতে পেরেছিলেন এবং তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো তার নির্বাচনী এজেন্ডার কেন্দ্রে এনেছিলেন, যার ফলে এই ঐতিহাসিক বিজয় সম্ভব হয়েছে। তবে ৪ নভেম্বর মঙ্গলবারের ঠিক আগের দিন (সোমবার) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুশিয়ারি দেন যে, যদি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটি মেয়র নির্বাচনে জয়ী হন, তবে তিনি ফেডারেল তহবিল বন্ধ করে দেবেন। এদিন ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে লেখেন, ‘একজন কমিউনিস্ট শহরের নেতৃত্বে এলে নিউইয়র্ক সিটি আরও খারাপ হবে।’ তিনি নিউইয়র্কবাসীকে সতর্ক করেন যেন তারা মেয়র নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়াকে ভোট না দেন। ট্রাম্প পোস্টে আরও লেখেন, ‘কার্টিস স্লিওয়াকে ভোট দেওয়া মানে মামদানিকেই ভোট দেওয়া।’

একই দিন সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে নিউইয়র্কের ভোটারদের বলেন, ‘আপনি ব্যক্তিগতভাবে অ্যান্ড্রু কুওমোকে পছন্দ করুন বা না করুন, আপনার কাছে আসলে কোনো বিকল্প নেই। আপনাকে তাকে ভোট দিতেই হবে, তিনি সেটা পারেন, মামদানি পারেন না!’

ট্রাম্পের তহবিল বন্ধের হুমকি এবং কুওমোকে সমর্থন করার কারণে মামদানির সমর্থকরা, বিশেষ করে প্রগতিশীল ও বামপন্থি ভোটাররা, এটিকে নিউইয়র্কের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এর ফলে তারা প্রতিবাদী হয়ে আরও বেশি সংখ্যায় মামদানিকে ভোট দেন। এই নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল ১৯৬০-এর দশকের পর সবচেয়ে বেশি, যা দেখায় নিউইয়র্কবাসী এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত ছিল। বিজয় ভাষণে মেয়র নির্বাচিত মামদানি সরাসরি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ জানান। তার ব্রুকলিনের বিজয় ভাষণে মামদানি বলেন : ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প, আমি জানি আপনি দেখছেন, আপনার জন্য আমার চারটি শব্দ : টার্ন দ্য ভলিউম আপ।’ তিনি তার ভাষণে ‘স্বেচ্ছাচারিতা এবং ধনিকতন্ত্র’-এর নিন্দা জানান এবং ঘোষণা করেন, ‘রাজনৈতিক অন্ধকারের এই মুহূর্তে, নিউইয়র্কই হবে আলো।’

যে কারণে জোহরান মামদানি মেয়র হিসেবে যোগ্য-

জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদে নির্বাচিত হয়েছেন নানা কারণে, তার যোগ্যতা মূলত তার আদর্শ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং অভূতপূর্ব জনসমর্থন দ্বারা প্রমাণিত, যা নিউইয়র্ক সিটির বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোর প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে তার নেতৃস্থানীয় সামাজিক ন্যায়ের জন্য সংগ্রাম, কর্মজীবী শ্রেণির জীবনযাত্রার খরচ কমানোর ওপর দৃঢ় প্রতিশ্রুতি, জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং স্থানীয় জনগণের বাস্তব সমস্যা বোঝার ক্ষমতা।

১. জোহরান মামদানির মেয়র পদে বিজয় এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি বিরোধিতা এবং ফেডারেল তহবিল বন্ধের হুমকি সত্ত্বেও ভোটাররা মামদানিকে বেছে নিয়েছেন, যা প্রমাণ করে যে নিউইয়র্কবাসী অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তাদের প্রগতিশীল আদর্শে আস্থা রেখেছে।

২. মামদানি নিউইয়র্ক স্টেট বিধানসভার সদস্য হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন নিম্ন আয়ের মানুষের অধিকার এবং আবাসনসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াই এবং বাসস্থান সংরক্ষণের কাজ করেছেন।

৩. তিনি ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট দলের সদস্য, যা তাকে শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের জন্য শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সহায়ক করেছে।

৪. প্রচারাভিযানে বিলবোর্ড বা বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগসংক্রান্ত বড় স্বাভাবিক পদ্ধতির পরিবর্তে সরাসরি মানুষের দরজায় গিয়ে, মামদানি তাদের সমস্যাগুলো শুনে কাজ করেছেন।

৫. মামদানি জনগণের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলেছেন, বাসাতেই গিয়ে ভাড়া ও শিক্ষার খরচ বৃদ্ধির মতো বাস্তব প্রশ্ন তুলে ধরেছেন, যা জনগণকে আকৃষ্ট করেছে।

৬. তিনি নিউইয়র্ক শহরের প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, যা বহুমাত্রিক সমাজের প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

৭. তার বিজয় কেবল স্থানীয় সমস্যার সমাধান নয়, এটি আমেরিকান রাজনীতিতে এক ‘নতুন প্লেবুকের’ ইঙ্গিত যা ট্রাম্প-যুগের রাজনীতির বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রগতিশীল পাল্টা আখ্যান তৈরি করেছে। তার বিজয় ভাষণে ‘স্বেচ্ছাচারিতা ও ধনিকতন্ত্রের’ নিন্দা এবং ‘নিউইয়র্কই হবে আলো’ ঘোষণা করার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তিনি জাতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কথা বলার সাহস রাখেন।

৮. মামদানি নিউইয়র্কে বাসচালকসহ শ্রমজীবী মানুষের জন্য বড় লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যেটি বড় করপোরেট ও অভিজাত শ্রেণির বিরুদ্ধেও আন্দোলন।

৯. তিনি রাস্তা থেকে রাজনীতিতে উঠে এসে অভিজ্ঞ এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রার্থীদের পরাজিত করেছেন, যা বিশ্বের অন্যতম বৈচিত্র্যপূর্ণ এই শহরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করেছে।

এগুলোসহ তার নেতৃত্বের গুণাবলি, জনগণ সংযোগ এবং শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকার তাকে মেয়র হিসেবে যোগ্য করে তোলে।

জোহরান মামদানির এই বিজয় কেবল এক রাজনৈতিক উত্থান নয়, এটি নিউইয়র্ক সিটির চিরপরিবর্তনশীল জনসংখ্যার একটি সুস্পষ্ট প্রতিক্রিয়া। শহরের প্রথাগত ক্ষমতা কাঠামোর বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহে মামদানি একটি নতুন কোয়ালিশন তৈরি করতে সফল হয়েছেন, যা দেখিয়ে দিয়েছে অর্থ এবং ক্ষমতা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট সামাজিক এজেন্ডাই জয়ী হয়। ঐতিহাসিকভাবে ডেমোক্র্যাটপ্রধান এই মহানগরীতে মামদানি বিপুল সমর্থন পেয়েছেন শহরের সেসব নিম্ন আয়ের মানুষ, মধ্যবিত্ত ভাড়াটিয়া এবং তরুণ প্রজন্মের কাছ থেকে, যারা আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার। তার সমাজতান্ত্রিক বার্তা আফ্রিকান-আমেরিকান, হিস্পানিক, এশীয় অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিশেষ করে, বাঙালি ও মুসলিম সম্প্রদায় এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে তার পরিচয় এবং প্রগতিশীল এজেন্ডা অভূতপূর্ব সাড়া জাগিয়েছিল।

এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে, নিউইয়র্ক শহর তার ‘পুঁজিবাদের রাজধানী’ পরিচয় ছাপিয়ে, এখন আশা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতীক হতে প্রস্তুত।

এইচ বি রিতা : শিক্ষক ও সাহিত্যিক, নিউইয়র্ক

মতামত লেখকের নিজস্ব