চিন্তা ও সম্পর্ক গ্রাস করছে
আজকের পৃথিবীতে স্মার্টফোন ছাড়া জীবন কল্পনাই করা যায় না। ঘুম থেকে ওঠার অ্যালার্ম থেকে শুরু করে রাতের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই ক্ষুদ্র যন্ত্রটি আমাদের হাতেই থাকে। এটি শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এক কথায় আমাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ, শিক্ষা, বিনোদন ও তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে স্মার্টফোন এখন তরুণ প্রজন্মের প্রথম পছন্দ। একসময় যে কাজের জন্য কম্পিউটার বা বইয়ের প্রয়োজন হতো, এখন সেটি হয় হাতের মুঠোয় থাকা এই যন্ত্রে। আধুনিক তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে অনলাইন ক্লাস, অফিশিয়াল কাজ, এমনকি আয়-রোজগার পর্যন্ত স্মার্টফোনের মাধ্যমে করছে। এক অর্থে স্মার্টফোন তরুণ সমাজের ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই নির্ভরশীলতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভয়ংকর এক মানসিক ফাঁদ।
স্মার্টফোন আসক্তির মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম শুধু সময়ই নষ্ট করছে না, তারা বিশাল ডেটা বাণিজ্যের শিকার হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যম এবং গেমিং অ্যাপগুলো ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য, আগ্রহ এবং আচরণ সংগ্রহ করে বিজ্ঞাপন কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করে। এই অর্থনৈতিক শোষণ প্রায়ই অদৃশ্য থাকে। এছাড়া অনেক গেমিং অ্যাপে ‘ইন-অ্যাপ পারচেজ’ বা ভার্চুয়াল কেনাকাটার মাধ্যমে তরুণরা প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। এই আসক্তি পরিবারের আর্থিক চাপ বাড়ায় এবং তরুণদের অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জনের দিকে ঠেলে দেয়।
স্মার্টফোনের মূল শক্তি তার সহজলভ্যতা। হাতের কাছে সব সময় পাওয়া যায় বলে এটি আসক্তির রূপ নেয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও কিশোর বয়সীরা এর প্রলোভনে দ্রুত পড়ে যায়। ইউটিউব, টিকটক, গেমস কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবিরাম নোটিফিকেশন আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক আনন্দ হরমোনের অতিরিক্ত নিঃসরণ ঘটায়। এই আনন্দই আস্তে আস্তে নেশায় রূপ নেয়। একজন তরুণ বুঝতেই পারে না কখন বিনোদন থেকে সে নির্ভরশীলতায় চলে গেছে।
একসময় বিকালের আড্ডা, একসঙ্গে চা খাওয়া বা পরিবারের গল্প ছিল সাধারণ দৃশ্য। এখন সেই জায়গা নিয়েছে নিস্তব্ধতা। সবাই নিজের ফোনে ডুবে থাকে, অথচ পাশে বসা মানুষটির সঙ্গে কথা হয় না। বাবা-মা, সন্তান, ভাই-বোন সবাই এক ছাদের নিচে থেকেও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন। এটি শুধু পারিবারিক বন্ধন দুর্বল করছে না, বরং সমাজে এক নতুন একাকিত্বের সংস্কৃতি তৈরি করছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ২০২৫ সালে শহরাঞ্চলে পারিবারিক যোগাযোগ আগের তুলনায় ৩৬ শতাংশ কমেছে, যার অন্যতম কারণ মোবাইল নির্ভরতা। অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণ সমাজ। রাত জেগে ফোন ব্যবহার, ভার্চুয়াল জগতে অতিরিক্ত সম্পৃক্ততা এবং অবিরাম তথ্যপ্রবাহ তাদের মানসিক স্থিতি নষ্ট করছে। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৪২ শতাংশ তরুণ প্রতিদিন পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় ফোনে ব্যয় করে। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশের ঘুমের ব্যাঘাত এবং ৩৮ শতাংশের উদ্বেগ ও বিষণ্নতা দেখা গেছে। স্মার্টফোন এখন কেবল একটি যন্ত্র নয়, মানসিক ভারসাম্য নষ্টের অন্যতম উপাদান।
আরও পড়ুন:
বৈষম্যের ছোবলে নারীর শ্রমবাজার
বর্তমানে তরুণদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর আসক্তি দেখা যাচ্ছে অনলাইন গেমে। পাবজি, ফ্রি ফায়ার, ক্লাস অব ক্ল্যান, এমনকি নতুন ভার্চুয়াল রিয়েলিটি গেমস তরুণদের বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। গেম জেতার উত্তেজনা, ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব ও অনলাইন প্রতিযোগিতা তাদের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে কিশোরদের জড়িয়ে থাকা ৫০০টির বেশি সাইবার অপরাধের সঙ্গে গেম আসক্তি সম্পর্কিত ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের আদর্শ বা বিলাসবহুল জীবনযাত্রা দেখে তরুণদের মধ্যে হীনম্মন্যতা ও হতাশা জন্ম নেয়। তারা নিজেদের জীবনকে অন্যের ভার্চুয়াল ‘শো-অফ’-এর সঙ্গে তুলনা করে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়। অনেক সময় লাইক বা কমেন্টের মাধ্যমে সামাজিক স্বীকৃতি অর্জনের আকাক্সক্ষা তাদের অস্বাভাবিক আচরণ করতে উৎসাহিত করে। এই ‘শো-অফ’ সংস্কৃতি তরুণদের বাস্তব জীবনের অর্জন এবং আত্মমূল্যায়নের পরিবর্তে ভার্চুয়াল প্রশংসার পেছনে ছুটতে শেখায়।
প্রতিদিন অন্তত কয়েক ঘণ্টা ফোন থেকে দূরে থাকা বা ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ এখন সময়ের দাবি। স্মার্টফোনে থাকা কিছু বিশেষ অ্যাপ রয়েছে যা ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করতে সহায়তা করে। তবে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ। পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তরুণদের শেখাতে হবে কীভাবে প্রযুক্তির সঙ্গে ভারসাম্য রেখে চলতে হয়। সচেতনতার মাধ্যমেই এই অদৃশ্য নেশার বাঁধন ভাঙা সম্ভব। মোবাইল আসক্তি রোধে পরিবার ও বিদ্যালয় উভয়ের ভূমিকা অপরিহার্য। বাবা-মাকে জানতে হবে সন্তানের ফোন ব্যবহারের সময় ও উদ্দেশ্য। অন্যদিকে শিক্ষকরা ডিজিটাল শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা দিতে পারেন যাতে প্রযুক্তি তাদের জীবনের সহায়ক হয়, নিয়ন্ত্রক নয়।
তরুণ সমাজই একদিন দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তাই তাদের প্রযুক্তিনির্ভর নয়, প্রযুক্তিকে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হতে হবে। স্মার্টফোন হবে তাদের উন্নয়নের হাতিয়ার, ধ্বংসের কারণ নয়। প্রয়োজন শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতার। সমাজ যদি একসঙ্গে এই সমস্যা মোকাবিলা করে, তাহলে স্মার্টফোন হয়ে উঠবে তারুণ্যের সম্ভাবনার প্রতীক। অন্যথায় এই আসক্তি একদিন গ্রাস করবে পুরো প্রজন্মকে যা হবে জাতির জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয়।
আরও পড়ুন:
ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন মানবজাতি
মো. নূর হামজা পিয়াস : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
আরও পড়ুন:
রহস্যে ঘেরা এক অসম যুদ্ধ!