সময় বদলেছে, বদলাতে হবে শিক্ষাব্যবস্থা
একসময় আমরা বিশ্বাস করতামÑ ভালো নম্বরই ভালো শিক্ষার প্রমাণ। মুখস্থ বিদ্যা, পরীক্ষার খাতা, আর ফলাফলÑ এই ছিল শিক্ষার চৌহদ্দি। কিন্তু আজকের পৃথিবী ভিন্ন। এখন আর কেবল কে বেশি জানে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং কে জানাকে কাজে লাগাতে পারে, সেটিই আসল যোগ্যতা। এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গিই জন্ম দিয়েছে এক বিপ্লবাত্মক ধারণা-ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা (Outcome Based Learning বা OBL)। বাংলাদেশেও এখন এই ধারণা ধীরে ধীরে মূলধারার শিক্ষায় জায়গা করে নিচ্ছে।
ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা কী : ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার লক্ষ্য শুধু বই শেষ করা নয়, বরং শিক্ষার্থীর মধ্যে বাস্তব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও মূল্যবোধ গড়ে তোলা। একটি উদাহরণ ধরা যাকÑ একজন প্রকৌশল ছাত্র যদি পড়াশোনার শেষে শুধু সূত্র জানে কিন্তু একটি সেতুর লোড হিসাব করতে না পারে, তবে সেই শিক্ষা অপূর্ণ। ওবিএল বলে, তুমি কী জানো তা নয়, তুমি জানাকে কীভাবে প্রয়োগ করতে পারোÑ সেটিই আসল শিক্ষা।
বাংলাদেশে ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা এর আবির্ভাব : বাংলাদেশে ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা নতুন নয়, তবে এর কার্যকর প্রয়োগ শুরু হয়েছে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিশ্চিত করছেÑ একজন ছাত্র ডিগ্রি অর্জনের পর কেবল ‘পাস’ নয়, বরং ‘দক্ষ’ হয়ে বেরিয়ে আসছে।
কেন এই পরিবর্তন দরকার ছিল : বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে মুখস্থনির্ভরতা ও তত্ত্বনির্ভর মূল্যায়ন আধিপত্য করেছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো করলেও বাস্তবজীবনে দক্ষতার অভাবে পিছিয়ে পড়ে। জাতিসংঘের এক রিপোর্টে বলা হয়Ñ বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ নতুন তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু তাদের মধ্যে ৪০%-এর বেশি কর্মদক্ষতার মানে ঘাটতি রয়েছে। ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা সেই ঘাটতি পূরণের দিকেই এক বড় পদক্ষেপ। এটি শিক্ষার্থীকে শেখায় চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে, প্রয়োগ করতে।
ফলাফলভিত্তিক শিক্ষার মূল দর্শন : ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা চারটি মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েÑ ১. স্পষ্ট লক্ষ্য (ঈষবধৎ ঙঁঃপড়সবং) : প্রতিটি কোর্সের শুরুতেই নির্ধারিত থাকে শিক্ষার্থীর কী শেখা উচিত। ২. দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা (ঈড়সঢ়বঃবহপু ঋড়পঁং) : শেখার লক্ষ্য হলো কর্মজীবনে প্রয়োগযোগ্য দক্ষতা অর্জন। ৩. অবিরাম মূল্যায়ন (ঈড়হঃরহঁড়ঁং অংংবংংসবহঃ) : শেখা কেবল পরীক্ষার দিনে নয়; প্রতিটি প্রজেক্ট, প্রেজেন্টেশন ও অংশগ্রহণে মূল্যায়িত হয়। ৪. ফিডব্যাক ও উন্নয়ন (ঋববফনধপশ ্ ওসঢ়ৎড়াবসবহঃ) : শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই ফিডব্যাক নিয়ে পরবর্তী ধাপে উন্নতি করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার নতুন মানচিত্র : বাংলাদেশে ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষাতেও প্রবেশ করছে। ২০২৩ সাল থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন ঈড়সঢ়বঃবহপু-ইধংবফ ঈঁৎৎরপঁষঁস চালু করেছে, যেখানে মুখস্থের বদলে ‘কী জানে, কীভাবে জানে এবং কী করতে পারে’Ñ এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপÑ আগে একজন শিক্ষার্থী রসায়নের সূত্র মুখস্থ করত; এখন সে সেই সূত্র দিয়ে কীভাবে পানির বিশুদ্ধতা নির্ধারণ করা যায়, সেটি শিখছে। এই পরিবর্তন শুধু শিক্ষার পদ্ধতিতেই নয়, চিন্তার দৃষ্টিভঙ্গিতেও এক বিপ্লব।
প্রচলিত বনাম ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা : বিষয় প্রচলিত শিক্ষা ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা কেন্দ্রবিন্দু শিক্ষক শিক্ষার্থী শিক্ষণ পদ্ধতি মুখস্থ ও বক্তৃতাভিত্তিক গবেষণা, প্রজেক্ট ও অংশগ্রহণভিত্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষার মাধ্যমে ধারাবাহিক মূল্যায়ন লক্ষ্য সিলেবাস শেষ করা দক্ষতা অর্জন ফলাফল জিপিএ বাস্তব কর্মদক্ষতা।
বাংলাদেশে ফলাফলভিত্তিক শিক্ষার সাফল্যের কিছু দৃষ্টান্ত
১. কটঊঞ-এর উদ্ভাবন ল্যাব : খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন প্রতিটি কোর্স শেষে শিক্ষার্থীরা প্রজেক্ট উপস্থাপন করেÑ যা তাদের ঈড়ঁৎংব ঙঁঃপড়সব পূরণ করছে কিনা তা যাচাই হয়। ২. ইটঊঞ-এর রুব্রিকস মূল্যায়ন পদ্ধতি : প্রতিটি ছাত্রের পারফরম্যান্স পরিমাপ করা হয় নির্দিষ্ট মানদণ্ডে (ৎঁনৎরপং), যা শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করেছে। ৩. পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসমূহে স্কিলভিত্তিক কোর্স : কারিগরি শিক্ষায় এখন ঙঁঃপড়সব ইধংবফ গড়ফঁষব ব্যবহৃত হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জনের পরই পরবর্তী ধাপে যেতে পারে।
চ্যালেঞ্জ : স্বপ্নের পথে কাঁটা ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা যত আকর্ষণীয় শোনায়, বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করা সহজ নয়। বাংলাদেশে এ পদ্ধতির পথে কিছু বড় বাধা রয়েছেÑ ১. শিক্ষক প্রশিক্ষণের অভাব : ঙঁঃপড়সব গধঢ়ঢ়রহম, জঁনৎরপং, ও ঈড়হঃরহঁড়ঁং ঊাধষঁধঃরড়হ বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। ২. প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা : অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও খবধৎহরহম গধহধমবসবহঃ ঝুংঃবস (খগঝ) নেই। ৩. অতিরিক্ত কাগজপত্র ও প্রশাসনিক চাপ : প্রতিটি কোর্সের ঈঙ-চঙ গধঢ়ঢ়রহম, জবংঁষঃ অহধষুংরং তৈরি করা সময়সাপেক্ষ। ৪. শিক্ষার্থীর অনাগ্রহ : অনেক শিক্ষার্থী এখনও মুখস্থনির্ভর পদ্ধতিতেই বেশি স্বচ্ছন্দ।
সমাধানের পথ : পরিবর্তন শুরু হোক শিক্ষকের হাত ধরে ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা সফল করতে হলে প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন যদি নিয়মিত ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা কর্মশালা চালু করে, তবে শিক্ষকরা নতুন পদ্ধতিতে আরও দক্ষ হবেন। এছাড়াÑ ক. প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে খগঝ বাধ্যতামূলক করা, খ . ফলাফল ম্যাপিং সফটওয়্যার তৈরি করা, গ. এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তবভিত্তিক প্রজেক্ট বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মনে রাখতে হবে- ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা কোনো ফরম নয়, এটি একটি চিন্তার পরিবর্তন।
ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ : বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের পথে। এই অভিযাত্রায় ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা হতে পারে সবচেয়ে বড় ভিত্তি। কারণ এই পদ্ধতি তৈরি করেÑক. চিন্তাশীল নাগরিক, খ. দক্ষ কর্মী, গ. এবং নৈতিক নেতৃত্ব গুণসম্পন্ন তরুণ প্রজন্ম। একজন ফলাফলভিত্তিক শিক্ষার্থী শুধু চাকরি খোঁজে না, বরং চাকরি তৈরি করতে শেখে।
শিক্ষার নতুন প্রভাত। আজ যখন বিশ্ব এগিয়ে চলছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দিকে, তখন মুখস্থনির্ভর শিক্ষা আমাদের আর এগিয়ে নিতে পারবে না। প্রয়োজন এমন শিক্ষা যা চিন্তা, প্রয়োগ, উদ্ভাবন Ñএই তিন স্তম্ভে দাঁড়ানো। ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা সেই দরজা খুলে দিচ্ছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি একযোগে এই পথে হাঁটে, শিক্ষকরা যদি সত্যিকারের পরামর্শদাতা হয়ে ওঠেন, আর শিক্ষার্থীরা যদি শেখার আনন্দ আবিষ্কার করেÑ তবে একদিন ‘মুখস্থনির্ভর বাংলাদেশ’ থেকে আমরা হব ‘দক্ষ ও চিন্তাশীল বাংলাদেশ।’ এটাই আমাদের পরবর্তী শিক্ষাবিপ্লবÑ এটাই ফলাফলভিত্তিক শিক্ষার জয়যাত্রা।
সুমনা গুপ্তা : শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
আরও পড়ুন:
মার্কিন শ্রমনীতি দেশের জন্য কতটুকু প্রযোজ্য?
মতামত লেখকের নিজস্ব