পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হবে

রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকাণ্ড

সম্পাদকীয়
১৬ অক্টোবর ২০২৫, ০৮:৪৮
শেয়ার :
পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হবে

রাজধানীর রূপনগরের শিয়ালবাড়ী এলাকায় একটি রাসায়নিক গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এত আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১৬ জনের। আগুন শুধু গুদামেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বিস্ফোরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে পাশের চারতলা ভবনে। অধিকাংশ লাশ উদ্ধার হয়েছে ভবনের ভেতর থেকে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখানে প্রবেশের আগে বিশেষ সুরক্ষা পোশাক পরে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কারণ আগুনের তাপ ও বিষাক্ত গ্যাস পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

বছরের পর বছর নানা ট্র্যাজেডি, প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরও এই ধরনের গুদাম নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেই পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে। ২০১০ সালে নিমতলীর আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিলেন ১২৪ জন। ২০১৯ সালে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় রাসায়নিক গুদামের আগুনে মারা যান আরও ৭১ জন। এর আগেও পুরান ঢাকায় একের পর এক রাসায়নিক গুদাম ট্র্যাজেডি ঘটেছে, কিন্তু সেই ইতিহাস যেন কিছুই শেখায়নি নগর প্রশাসনকে। প্রতিবারই আগুনের পর তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা আসে, দায় নির্ধারণের প্রতিশ্রুতি শোনা যায়, কিন্তু বাস্তবে তা থেকে কোনো স্থায়ী সমাধান বেরিয়ে আসে না। শিয়ালবাড়ীর ঘটনাটি মূলত একই ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা। গুদামটি টিনশেড, তাতে রাসায়নিক মজুদ ছিল, কিন্তু কোনো ধরনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। ভবনের ওপর টিনশেড দিয়ে অবৈধভাবে বাড়তি তলা তোলা হয়েছিল। ফায়ার সেফটি প্ল্যান নেই, লাইসেন্স নেই- তবু বছরের পর বছর গুদাম ও কারখানা চালু ছিল। আশপাশে পোশাক কারখানা, বসতবাড়ি ও বিপণিকেন্দ্র- সব মিশে গেছে এলোমেলোভাবে। এই অনিয়মই একদিন পরিণত হলো ভয়াবহ মৃত্যুকূপে।

প্রশ্ন জাগে- কেন রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলোতে আজও রাসায়নিক মজুদের বিপজ্জনক গুদাম আছে? সংস্থাগুলোই কীভাবে বছরের পর বছর ধরে চোখ বুজে থাকে? বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশে নগর উন্নয়ন ও শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা বরাবরই সবচেয়ে উপেক্ষিত ক্ষেত্রগুলোর একটি। শিল্প ভবনে পর্যাপ্ত ফায়ার এক্সিট নেই, জরুরি সিঁড়ি বা ধোঁয়া নির্গমনের পথ থাকে না, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম অচল অবস্থায় পড়ে থাকে। বহু সময় দেখা গেছে, ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ছাড়া বছর বছর ব্যবসা চলছে, কেউ তা দেখে না, জবাবদিহিও হয় না। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স একাধিকবার সতর্ক করেছে- রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা’ ঘোষণা করেছে কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ তেমন একটা দেখা যায়নি।

রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে নেওয়ার প্রশ্নেও বারবার দেখা গেছে নানা টালবাহানা। ২০১০ সালের মর্মান্তিক ঘটনার পর পুরান ঢাকা থেকে সব রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে নেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এরপরও আজও সেসব গুদামের অনেকগুলো আগের জায়গাতেই আছে, আবার নতুন নতুন জায়গায়ও গড়ে উঠছে। শুধু পুরান ঢাকাই নয়, রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, মুগদা- সব এলাকায়ই এ ধরনের অননুমোদিত গুদাম গড়ে উঠেছে চোখের সামনে। এই নীরবতা আর অব্যবস্থাপনাই আজকের এই শিয়ালবাড়ী ট্র্যাজেডির মঞ্চ তৈরি করেছে।

এই ভয়াবহ আগুন আমাদের আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, নিরাপত্তাহীনতা শুধু পুরান ঢাকার সমস্যা নয়, পুরো নগরীর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগর পরিকল্পনা ও শিল্প স্থাপন ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে। ভবনের নকশা অনুমোদনের সময় নিরাপত্তা যাচাইয়ের যে প্রক্রিয়া থাকা উচিত, তা প্রায়ই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাও বড় সমস্যা।

এখন প্রশ্ন হলো- আর কত মৃত্যু হলে পদক্ষেপ আসবে? আগুনের ঘটনায় শোক, মানবিক সহমর্মিতা আর প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। প্রয়োজন কঠোর বাস্তবায়ন। সেজন্য রাজধানীর সব রাসায়নিক গুদাম ও অননুমোদিত শিল্প স্থাপনা শনাক্ত করে অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়া উচিত। শুধু পুরান ঢাকা নয়, পুরো নগরীর জন্য একটি নতুন ম্যাপ তৈরি করা দরকার।

অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ও ফায়ার সেফটি প্ল্যান ছাড়া কোনো কারখানা বা গুদাম চালু রাখতে দেওয়া যাবে না। আর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ভবন মালিক ও গুদাম মালিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতা। যতক্ষণ পর্যন্ত বাস্তবে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হবে, ততক্ষণ এই ধরনের আগুনে মৃত্যু থামবে না। এই শহরে জীবনের চেয়ে সস্তা আর কিছু যেন নেই- এমন নির্মম বাস্তবতা আর মেনে নেওয়া যায় না।