আস্থা থাকা না-থাকা
মানুষ বিশ্বাস ছাড়া বাঁচে না, এমনকি অবিশ্বাসও তো বিশ্বাসই এক প্রকারের। তবে এটাও সাধারণত দেখা যায় যে, ইহজাগতিক ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা যতই কমে পারলৌকিকতা ও প্রতারণায় বিশ্বাস ততই বাড়ে। আস্থা হারিয়ে কেউ চলে যায় ধর্মের দিকে, কেউ বা প্রতারণা-অভিমুখে। প্রতারকদের একাংশ যে ধার্মিক সাজে না এমনও নয়। বৃদ্ধি পায় আলস্য এবং নেশাগ্রস্ততা। নেশা অবশ্য নানা প্রকারের হয়, হয়ে থাকে।
ছেলেবেলার একটি দৃশ্য আমি কখনও ভুলব না। ঢাকা শহরে ব্যবসা-বাণিজ্যের তখনকার প্রধান কেন্দ্র চকবাজারের পাশেই আমাদের বাসা ছিল, বেগমবাজারে। যেতে-আসতে প্রায় রোজই আমার অনিষ্পলক চোখ দুটি পড়ত গিয়ে সরিষার তেলের একজন আড়তদারের ওপর। তার শরীর-স্বাস্থ্য, বসার ভঙ্গি, চোখ-মুখের নিস্পৃহতা সবকিছুর ভেতর থেকেই একটা অলৌকিক আভা ছিল। যেন তিনি এ-জগতের নন, ভিন্নালোকের। অথচ খুবই ইহজাগতিক ছিলেন তিনি। নেতা ছিলেন ঢাকা শহর মুসলিম লীগের, বড় রকমেরই। তার চেয়েও বড় সত্য এই যে, সেকালেই সরিষার তেলের সঙ্গে তিনি মবিল মেশাতেন। জানত সবাই। কিন্তু বড়ই নির্বিকার ছিলেন, দেখেছি আমি। আমার বাবার প্রধান বিনোদন ছিল বাজার করা। বাজার থেকে সরিষার তেল আনতেন যখন, আমার মনে জিজ্ঞাসা জাগত বিষ কিনে আনেননি তো, যে বিষ ওই আপাত ধার্মিক ভদ্রলোক বেশ করে মিশিয়ে দিয়েছেন তেলের সঙ্গে। এখন বুঝতে পারি ভদ্রলোক নির্ভেজালরূপে বিশ্বাসী ছিলেন। বিশ্বাস ছিল পুলিশ তাকে ধরবে না, তার টাকা আছে তদুপরি তিনি মুসলিম লীগের লোক। বিশ্বাস ছিল পুলিশে ধরলেও আদালত তাকে ছেড়ে দেবে, ওই একই কারণে। সেই বয়সে আমি আমার নিত্যদেখা ওই লোকটিকে খুবই ঘৃণা করতাম, ভয় করতাম বোধ করি আরও অধিক। ওই বিশ্বাসীকে আমি এখনও দেখতে পাই। মানসচক্ষে। কিন্তু পরে বুঝেছি তিনি একা ছিলেন না, অনন্য নন, অনেকের একজন। এরা আস্থাহীন ইহজাগতিক ব্যবস্থায়; এরা বিশ্বাসী প্রতারণায় এবং আবরণ নেয় ধর্মের। সেকাল গেছে চলে, একালে অনেক কিছু বদলেছে, উন্নতি ঘটেছে বহু ক্ষেত্রে, কিন্তু আস্থা জিনিসটা মোটেই বাড়েনি, বরং কমেছে। আস্থার বড়ই দুর্দশা এই স্বাধীন বাংলাদেশে। ওই যে বিশেষ দুটি ক্ষেত্রে যাদের ওপর নাগরিকদের জীবন-মরণ, উন্নতি-অবনতি অনেকাংশে নির্ভর করে সেই পুলিশ ও আদালতের ওপর নির্ভরশীলতা ভেতর থেকেই ক্ষয় হয়ে এসেছে। বাংলাদেশ এখন আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের নির্দেশে চলে, সেই বিশ্বব্যাংকই ঘোষণা দিয়েছিল যে, বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতিপরায়ণ দেশগুলোর একটি। ব্যাপারটির বাস্তবতা এ রাষ্ট্রের নাগরিকরা পদে পদে ও হাড়ে হাড়ে অনুভব করে থাকেন। পুলিশ এ দেশে কখনই সাধারণ মানুষের বন্ধু ছিল না; এই বাহিনী সৃষ্টিই করা হয়েছিল মানুষকে রাজনৈতিকভাবে নিপীড়ন করার জন্য; সেই নিপীড়ন ব্রিটিশ আমলে ঘটেছে, পাকিস্তান আমলে অব্যাহত থেকেছে, বাংলাদেশ আমলে মোটেই কমেনি।
আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে না। এই ধারণাও পুরনো। সেখানে টাউটদের রাজত্ব ছিল, টাউটদের দৌরাত্ম্য এখন বৃদ্ধি পেয়েছে। আইনে ও বিচারে এভাবে আস্থা হারালে মানুষ যাবেটা কোথায়? কোথায় খুঁজবে আশ্রয়? খোঁজে ধর্মের কাছে। নিরাপত্তা হারানোর প্রাথমিক কারণটা অবশ্য রয়েছে অন্যত্র। রয়েছে অর্থনীতিতে। সেখানে দেখা যাচ্ছে অল্পকিছু মানুষ ওপরে উঠছে অধিকাংশ মানুষকে দলিত-মথিত-বিধ্বস্ত করে। এই পীড়িত মানুষের জন্য কোনো ইহজাগতিক আশ্রয় নেই, তাই তারা আঁকড়ে ধরে অলৌকিক শক্তিকে, সাহায্য চায়, ক্ষতিপূরণ আশা করে।
আমাদের পরীক্ষাব্যবস্থায় সৃষ্টিশীলতাকে উৎসাহিত করার ব্যাপারটা কখনই ছিল না। এখনও নেই। পরীক্ষায় মেধার পরীক্ষা হয় না, পরীক্ষা হয় মুখস্থ করার শক্তির। সৃষ্টি করবে না, ভাববে না, না-বুঝে মুখস্থ করবে, তার পর পরীক্ষার খাতায় যা তুমি সংগ্রহ করেছ কিন্তু ভুলেও হজম করোনি তা উদগিরণ করে দেবে এবং এই কর্মকা-ে কার কতটা দক্ষতা সেটার প্রমাণ দিয়ে নম্বর ও সার্টিফিকেট নিয়ে ঘরে চলে যাবে। এই হচ্ছে ব্যবস্থা। বলা বাহুল্য, এই ব্যবস্থা বদলায়নি। বিদেশি পর্যবেক্ষকরা আমাদের এই স্মরণশক্তিকে বিস্ময়কর বলেছেন। এই দক্ষতাটাও তো আসলে সবারই। মনে রাখার নকলটা প্রচ্ছন্ন, কাগজ দেখে নকল করাটা প্রত্যক্ষ; এটাই পার্থক্য। প্রত্যক্ষটা নিন্দনীয় বলে গোপনটা যে প্রশংসনীয় তা নিশ্চয়ই নয়।
আরও পড়ুন:
বৈষম্যের ছোবলে নারীর শ্রমবাজার
এ ক্ষেত্রে অনাস্থা যার ওপর প্রকাশ পাচ্ছে সেটা হচ্ছে শ্রমশীলতা। আমাদের দেশে শ্রম অত্যন্ত অবহেলিত এবং অবমূল্যায়িত। শ্রমজীবী মানুষ বংশানুক্রমে, জন্ম-জন্মান্তরে পরিশ্রম করে, করতেই থাকে এবং দরিদ্র থাকে। তারা চাষা ও কুলি, তাদের মর্যাদা দেবে কে? শ্রমের সাহায্যে কেউ ওপরে ওঠে না। ওঠে প্রতারণা ও চাটুকারিতায়, যে জন্য শ্রমের ওপর কেউ আস্থা রাখে না। স্বাধীনতা এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনেনি, অবনতি ছাড়া। এবং এটাও স্বাভাবিক যে, প্রতারক ও চাটুকাররা পরস্পরের প্রতি আস্থা রাখে না, বিশ্বাসও রাখে না। মানুষের অনেক গুণ, এমনকি অন্য প্রাণীর গুণাবলিও তার মধ্যে রয়েছে; যেমন কুকুরের গুণ। কুকুর বড়ই প্রভুভক্ত এবং পরস্পরের প্রতি হিংস্র, অন্য প্রাণীকে সহ্য করবে, কিন্তু নিজের প্রজাতির অপর কাউকে দেখামাত্র শোরগোল শুরু করে দেবে। বাংলাদেশের সমাজে ও রাষ্ট্রে প্রভুভক্তি যেমন দেখা যায়, তেমনি দেখা যায় মারাত্মক রকমের কলহপ্রবণতা। প্রভুর প্রতি আস্থা রাখলেও প্রতিবেশীকে ঘৃণা করে।
ভেজাল বাড়ছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বহুগুণ বেড়ে গেছে। কেউ ধরা পড়ছে না, ধরা পড়লেও শাস্তি হচ্ছে না, আস্থা বাড়ছে টাকার শক্তিতে। টাকায় সবকিছুই কেনা যায়। বড় বড়, এমনকি প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিরাও টাকার ক্রয়সীমার বাইরে নন। ন্যায়বিচার না পেলেও নিজের পক্ষে বিচার কেনা যায়, চিকিৎসা তো প্রকাশ্যে ও পরিপূর্ণরূপেই পণ্যে পরিণত।
সবকিছু মিলিয়ে সত্য ওই একটাই, মানুষের বিশ্বাস নেই নিরাপত্তা ও সুবিচারে, আস্থা নেই শ্রমে, শিক্ষায় কিংবা চিকিৎসায়। কেউ তার নিজের দায়িত্ব পালন করেন না। বিপন্ন জীবনানন্দ দাশ আবহমান ভাঁড়কে দেখেছিলেন গাধার পিঠে-বসা; ভাঁড় এখন সর্বত্র, তবে প্রায় কেউই গাধার পিঠে নেই, তারা রয়েছে বিভিন্ন পদে, গুরুত্বপূর্ণ সব আসনে। আর এটা বললে মোটেই মিথ্যা বলা হবে না যে, বেমানান ভাঁড় হোন কিংবা অতিসুচতুর দুর্বৃত্ত হোন, গুরুত্বপূর্ণ লোকদের মধ্যে এমন মানুষ খুব কমই রয়েছেন যারা বাংলাদেশের কোনো ভবিষ্যৎ রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন।
আরও পড়ুন:
ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন মানবজাতি
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আরও পড়ুন:
রহস্যে ঘেরা এক অসম যুদ্ধ!