আজ ইতিহাস গড়তে পারেন নারী ফুটবলাররা

জাহিদ রহমান
১০ আগস্ট ২০২৫, ০০:০০
শেয়ার :
আজ ইতিহাস গড়তে পারেন নারী ফুটবলাররা

মেয়েদের এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করার অনিঃশেষ আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার অনূর্ধ্ব-২০ নারী ফুটবল দল লাওসের মাটিতে নতুন এক চমক তৈরির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। নতুন এক আহ্বান আর হাতছানি তাদের সামনে। সেই আহ্বান আজ পূর্ণতা পেতে পারে। যদি পূর্ণতা লাভ করে সেটা হবে মেয়েদের ফুটবলের সাফল্যধারায় আরেকটি মাইলফলক। আজ ১০ আগস্ট ববিবার ঠিক বিকাল ৪টায় লাওসের নিউ লাওস স্টেডিয়ামে এই টুর্নামেন্টের অন্যতম শক্তিশালী দল দক্ষিণ কোরিয়ার মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। এটিই গ্রুপ পর্যায়ের শেষ ম্যাচ। এই ম্যাচে জয়ী হলে বাংলাদেশের মেয়েরা এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ নারী এশিয়ান কাপ ফুটবলের চূড়ান্ত পর্যায়ে খেলার এক অনবদ্য যোগ্যতা অর্জন করবেন।

এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের মেয়েরা লড়াই করছেন গ্রুপ ‘জি’তে। এই গ্রুপের চারটি দল হলো- আয়োজক দেশ লাওস, বাংলাদেশ, দক্ষিণ কোরিয়া ও তিমুর। ৬ আগস্ট বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচে আয়োজক দেশ লাওসকে ৩-১ গোলে পরাজিত করে রীতিমতো স্টেডিয়াম কাঁপিয়ে ফেলে। আর এর এক দিন পরেই ৮ আগস্ট গোলঝড় তুলে তিমুরকে ৮-০ গোলে পরাজিত করে বাংলার বাঘিনীরা আরও এক নতুন শক্তির স্বাক্ষর রাখেন। এদিকে বাংলাদেশের মুখোমুখি হওয়ার আগে দক্ষিণ কোরিয়ার মেয়েরা তিমুরকে ৯-০ গোলে এবং স্বাগতিক লাওসকে ১-০ গোলে পরাজিত করেছেন। গ্রুপের এই তুলনামূলক ফলাফলে বাংলাদেশ যে দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়ে এগিয়ে তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু পুরনো প্রবাদের ভাষায় বলতে হয়- সব ভালো যার শেষ ভালো। ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলার হয়তো সেই ভালোর জন্যই মুখ চেপে বসে আছেন। আবার কোরিয়ার ফুটবল ঐতিহ্য বলে কথা। কোরিয়াকে নির্বিবাদে বশ মানানো অবশ্যই কঠিন কাজ। কিন্তু আমাদের তারুণ্যদীপ্তিময় আফঈদা, সাগরিকারা যে স্বপ্নের বিনুনি তৈরি করেছেন সেটাও মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন হবে তা-ও নয়। ফিফা র‌্যাংকিংয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান এখন ২১। মানে আমাদের থেকে অনেক অনেক ওপরে। র‌্যাংকিংয়ে ২৪ ধাপের মতো এক বিরাট উত্থানের পরও আমাদের বর্তমান অবস্থান ১০৪। স্বভাবতই ব্যবধানটা লক্ষণীয়। তবে এর বিপরীতে আমাদের সাফল্য হলো সমসাময়িক কালে র‌্যাংকিংয়ে আমাদের ওপরে থাকা অনেক দলকেই হারানোর মধুময় অভিজ্ঞতা। হয়তো এই অভিজ্ঞতার আঘাত পড়তে পারে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর। নিশ্চয় বাংলাদেশ দলের কোচ পিটার বাটলার দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ফুটবল দলকে কিছু একটা দেখানোর অভিপ্রায় বুকের মাঝে পুষে রেখেছেন। আজ দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের মেয়েরা জিতলে তো সোনায় সোহাগা। আবার হারলেও এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ উইমেন এশিয়া কাপে কোয়ালিফাই করার সম্ভাবনা কিন্তু একদম উড়ে যাবে না। কেননা ফিফার রুলস অনুযায়ী মোট আটটি গ্রুপ (এ-এইচ) থেকে চ্যাম্পিয়ন দল মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। এর পরে আরও তিনটি দল নেওয়া হবে বেস্ট রানার্স আপ উইনারের ভিত্তিতে। এই এগারোটি দলের সঙ্গে আয়োজক দেশ থাইল্যান্ড মিলিয়ে মোট ১২টি দেশ চূড়ান্ত পর্বে খেলবে। এবারের এই আয়োজনে এশিয়ার মোট ৩৩টি দেশের নারী ফুটবল দল অংশগ্রহণ করেছে। তবে এই টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার আগে বাংলাদেশের মেয়েরা গত জুলাইয়ে দেশের মাটিতে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করে ভীষণরকম আত্মশক্তিতে বলীয়ান। এর তুমুল রিফ্লেকশন আমরা দেখতে পাচ্ছি ধারাবাহিক বিজয় আনন্দের উৎসবে। সবারই মনে থাকার কথা, সাফে বয়সভিত্তিক এই টুর্নামেন্টে শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান সব দলকেই বড় ধরনের ব্যবধানে পরাজিত করেই বাংলাদেশের মেয়েরা পঞ্চম শিরোপা লাভ করেন।

বয়সভিত্তিক এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ নারী এশিয়ান কাপ টুর্নামেন্টের সূচনা হয় ২০০২ সালে। তখন বয়সের সীমারেখা ছিল-১৯। সেবার প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় জাপান। টুর্নামেন্টের আয়োজক ছিল প্রতিবেশী দেশ ভারত। ২০২২ সাল থেকে এই টুর্নামেন্টের বয়সের সীমারেখা বাড়িয়ে ২০ করা হয়। সেবার আয়োজক দেশ উজবেকিস্তান হলেও কোভিডের কারণে এই টুর্নামেন্ট বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়। ২০২৪ সালে উজবেকিস্তান পুনরায় এই টুর্নামেন্টের আয়োজনের দায়িত্ব লাভ করে। সর্বশেষ আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে উত্তর কোরিয়ার মেয়েরা শক্তিশালী জাপানকে ২-১ গোলে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। এই টুর্নামেন্টে জাপান সবচেয়ে বেশি ৬ বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব মুঠোবন্দি করে আছে। এর পরেই রয়েছে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া।

এদিকে মেয়েদের ফুটবলে ফিফা র‌্যাংকিংয়ে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছেন আমাদের মেয়েরা। এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখানোর কারণেই এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। ফিফা র‌্যাংকিংয়ে ২৪ ধাপ এগিয়ে এসেছেন বাংলাদেশের মেয়েরা। ৭ আগস্ট প্রকাশিত নারী ফুটবলে ফিফার সর্বশেষ হালনাগাদ র‌্যাংকিংয়ে ২৪ ধাপ এগিয়ে যাওয়ার মধুর সংবাদটি পায় বাংলাদেশ। ১১৭৯.৮৭ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশ উঠে এসেছে ১০৪তম স্থানে। আমাদের মেয়েদের রেটিং পয়েন্ট বেড়েছে (+৮০.৫১)। ফিফা প্রদত্ত তথ্য মতে, এবারের হালনাগাদ র‌্যাংকিংয়ে সবচেয়ে বেশি সাফল্যের দল বাংলাদেশ, সবচেয়ে বেশি পয়েন্টও (+৮০.৫১) অর্জন করেছে বাংলাদেশ দল।

মেয়েদের ফুটবলে ফিফার শ্রেষ্ঠত্বে এখন স্পেন। এরপর রয়েছে আমেরিকা, সুইডেন, ইংল্যান্ড, জার্মানি। অন্যদিকে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সেরা অবস্থানে রয়েছে জাপান (র‌্যাংকিং ৮), উত্তর কোরিয়া (র‌্যাংকিং ১০), চীন (র‌্যাংকিং ১৬)। আর দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবার ওপরে রয়েছে ভারত (র‌্যাংকিং ৬৩), নেপাল (র‌্যাংকিং ৮৭), বাংলাদেশ (র‌্যাংকিং ১০৪)। কিন্তু সমসাময়িক কালে বাংলাদেশের মেয়ে ফুটবলাররা ভীষণ অদম্য। গত কয়েক মাসে মেয়েদের সাফল্যের ভিড়ে ছেলেদের ফুটবল যেন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। কদিন পর পরই মেয়েদের সাফল্য সংবাদে সিক্ত হচ্ছে সর্বত্র। আজ লাওসের মাটিতে আরেকটি নতুন ইতিহাস রচিত হোক আফঈদা, সাগরিকা, শিখা, পূজা, তৃষ্ণাদের আনন্দ অশ্রুতে! ‘আমাদের নারী ফুটবলাররা এখন অগ্নিমশাল। সাফল্যের আলো ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। আজ ওদের ঘামে-শ্রমে হোক আরও এক নতুন ইতিহাস। ওরা আমাদের নয়নের মণি হয়ে থাকুক। ওরা আরও নব আনন্দে প্রস্ফুটিত হোক লাওসের মাটিতে।’ মেয়ে ফুটবলারদের সাফল্যধারা নিয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় বলছিলেন সাবেক দ্রুততম মানবী লাভলী সুলতানা। আসলে সবার মনের কথাই এ রকম। আসুক সাফল্য, আসুক- আমাদের কন্যাদের শক্তি আর সাহসের স্রোতধারায়।


জাহিদ রহমান : ক্রীড়া লেখক ও গবেষক