জলাতঙ্করোধী টিকার সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিন
বাংলাদেশে জলাতঙ্ক একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এই সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। বর্তমানে দেশে জলাতঙ্ক টিকার সংকট এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যেখানে প্রতিবছর এই মরণব্যাধিকে দায়ী করা হয় শতাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে, সেখানে জীবনরক্ষাকারী টিকা সহজলভ্য না থাকা গভীর উদ্বেগের বিষয়।
আমাদের সময়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়Ñ রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে জলাতঙ্করোধী টিকার চরম সংকট দেখা দিয়েছে। গত মার্চ মাস থেকে বন্ধ রয়েছে রেবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন (আরআইজি) ভ্যাকসিনের সরবরাহ। ফলে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ রোগী এই হাসপাতালে আসেন। ইমিউনোগ্লোবিউলিন সরবরাহ বন্ধ থাকায় অনেকে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনছেন বেশি দামে। যা নিম্নআয়ের মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা অর্থনৈতিক সামর্থ্যরে ওপর নির্ভরশীল। এতে জনসাধারণের চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে। অনেকেই সময়মতো প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রতিষেধক মজুদ না থাকায় রোগী ফেরত যাচ্ছেÑ যা অগ্রহণযোগ্য। রোগী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্টি-রেবিস ভ্যাকসিন (১ মিলি) এবং আরআইজি ভ্যাকসিনের চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। ফলে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রোগীদের। চলতি বছর জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে তিনজনের মৃত্যুও হয়েছে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই দুর্বলতা সাধারণ মানুষের জীবনকে যেমন ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে, তেমনি সরকারের দায়বদ্ধতা ও প্রস্তুতির প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। ২০১৪ সাল থেকে হাসপাতালে বিনামূল্যে আরআইজি দিয়ে আসছিল জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচি সেন্টার। কুকুর, বিড়াল, শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ে ক্ষত হলে ভ্যাকসিনের পাশাপাশি এ ওষুধ দেওয়া জরুরি। কিন্তু এখন তা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দুর্ভোগ বাড়ছে। জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে।
আরও পড়ুন:
বৈষম্যের ছোবলে নারীর শ্রমবাজার
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ মানুষ কুকুর বা অন্যান্য প্রাণীর কামড়ের শিকার হন। তাদের একটি বড় অংশই সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে বিপদের মুখে পড়েন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কামড়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষত ধুয়ে ফেলা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জলাতঙ্কের প্রতিষেধক গ্রহণ করাই পারে জীবন বাঁচাতে। কিন্তু সরকারি হাসপাতালগুলোতে এ ওষুধের অভাব এবং ভোগান্তি এখন এক নিত্যদিনের ঘটনা। গ্রামীণ জনপদ ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে প্রতিষেধকের সরবরাহ প্রায় অনিয়মিত। রাজধানীর বাইরে অনেক জায়গায় এসব ওষুধ প্রায় দুর্লভ। এই সংকটের পেছনে রয়েছে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা। এর মধ্যে সরকারের বাজেট বরাদ্দ ও সরবরাহ চেইনে দুর্বলতা রয়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে যথাসময়ে ওষুধ পৌঁছায় না এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও তদারকির অভাবে অনেক জায়গায় মজুদ ও বিতরণ ব্যবস্থাও অকার্যকর। এতে করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগণ সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়ছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলোÑ যেসব জায়গায় বিনামূল্যে এই প্রতিষেধক দেওয়ার কথা, সেখানেও মাঝে মাঝে কালোবাজারি বা অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ উঠে এসেছে। এটি জনসেবার সঙ্গে জড়িত একটি অমানবিক ও ঘৃণিত অপরাধ, যার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসেবার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত নিয়ে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। স্বাস্থ্যের মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। জনসাধারণের জন্য মানসম্মত চিকিৎসাসেবা যেন নিছক প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে।
আরও পড়ুন:
ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন মানবজাতি
জলাতঙ্ক প্রতিরোধী চিকিৎসার অপ্রাপ্যতার কারণে যদি কোনো রোগী বঞ্চিত হয় বা কেউ মারা যায়, তা শুধু দুঃখজনকই নয়, রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক চরম ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে কোনো গাফিলতি কাম্য নয়। জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসাসামগ্রী সবার জন্য নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। যাতে প্রতিটি নাগরিকের জন্য জলাতঙ্ক প্রতিরোধী চিকিৎসা সহজলভ্য ও বিনামূল্যে পাওয়া নিশ্চিত হয়।
আরও পড়ুন:
দিকে দিকে মাফিয়াতন্ত্র-২