বাজেটে ‘সামাজিক সুরক্ষা’ খাত অবহেলিত কেন? করণীয় কী

ড. আশেক মাহমুদ
২৫ জুন ২০২৫, ০০:০০
শেয়ার :
বাজেটে ‘সামাজিক সুরক্ষা’ খাত অবহেলিত কেন? করণীয় কী

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করেছে উপদেষ্টা পরিষদ, যা চলতি অর্থবছরের (২০২৪-২৫) তুলনায় ৭ হাজার কোটি টাকা কম। পূর্বের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবারের বাজেটও হয়েছে অভাবী সংসারের বাজেটের মতো। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, যা দেশি ও বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে পূরণের পরিকল্পনা রয়েছে। ধার-দেনা করার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি বছর ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকার সুদ পরিশোধ করতে হয়, যা সর্বাধিক ব্যয়ের খাত হিসেবে পরিগণিত। ধার-দেনানির্ভর এই অর্থনীতিতে সামাজিক সুরক্ষা খাত অনেক বেশি অরক্ষিত হয়ে আছে।

সরকারিভাবে যদিও বাজেটকে যথারীতি ‘জনকল্যানমুখী’ বাজেট বলা হয়, আসলে এই বাজেট অনেক বেশি নিওলিবারেল অর্থনীতির বাজেট। নিওলিবারেল অর্থনীতির বাজেট বলতে সেই বাজেটকে বোঝায়, যে বাজেটে জনগণের ওপর সরকারের দায়-দায়িত্ব কম থাকে আর উৎপাদন ও সেবা খাতকে অনেক বেশি বেসরকারিকরণ করা হয়। এই বাজেট হলো বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ইশারায় লিখিত বাজেট। ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে আছে ‘কল্যাণমুখী’ অর্থনীতির বাজেট। অথচ বিশ্বব্যাংক আইএমএফ বহুজাতিক কোম্পানির ব্যবসা লাভজনক করতে এবং আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির বাজেট করা থেকে বিরত রাখতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে আমাদের নামিয়ে দিচ্ছে এই বাজেট। যারা এই প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না, তাদের জন্য রয়েছে মানবেতর জীবন। এই সূত্র অনুযায়ী আমাদের দেশে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বাজেট করা হয়।

সামাজিক সুরক্ষা খাতে বাজেট কতটুকু সুরক্ষা দিতে পারছে, তা দেখা দরকার। তার আগে জানা দরকার, সামাজিক সুরক্ষা মানে কী? সামাজিক সুরক্ষা মানে সমাজের হতদরিদ্র, স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠী, সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। বাজার ব্যবস্থার আলোকে বিচার করলে দেশে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও বেকার মানুষের সংখ্যা হবে ধারণাতীত। সরকারি হিসাবে বেকার ধরা হয় ২৭ লাখ (সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ পেলে তাকে বেকার ধরা হয় না)। সেদিক থেকে প্রকৃত বেকারের সংখ্যা হবে সোয়া এক কোটি বা তার বেশি। এর মানে কারা দরিদ্র, কারা হতদরিদ্র আর কারা বেকার- তার বিজ্ঞানভিত্তিক ও সামাজিক সংজ্ঞা সঠিকভাবে নিরূপিত না হলে সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে পরিকল্পনা কাজে দেবে না। সেই দিকে সরকারের মনোযোগ দেখছি না। সামাজিক সুরক্ষার দিককে এখানেই গুরুত্বহীন করা হয়।

হয়তো সরকার বলবে, আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ এর মধ্যে পেনশন বাবদ থাকছে ৩৫ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। এই টাকা বাদ দিতে হবে। কেননা, এই অর্থ কোনোভাবেই দরিদ্র বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাথে যায় না। ফলে পেনশন ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়াবে ৮১ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা। সরকার হয়তো বলবে, আগামী অর্থবছরে বয়স্কভাতার সুবিধাভোগী, বিধবা ও স্বামীনিগৃহীতা মহিলা সুবিধাভোগী এবং প্রতিবন্ধী ভাতা ও প্রতিবন্ধী শিক্ষা বৃত্তির সুবিধাভোগী ১ লাখের বেশি বাড়ানো হবে। সংখ্যা এত বাড়লে তো বরাদ্দ বাড়ানোর কথা।

অথচ নতুন বাজেটে বরাদ্দ পূর্বের বাজেটের চেয়ে কমিয়ে মোট বাজেটের ১৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। হয়তো সরকার বলবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে বেশ কিছু ভাতার হারও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। যেমন- বয়স্ক ভাতার মাসিক হার ৬০০ টাকা থেকে ৬৫০ টাকায়, বিধবা ও স্বামীনিগৃহীতা নারীদের মাসিক ভাতা ৫৫০ টাকা থেকে ৬৫০ টাকায়, প্রতিবন্ধীদের মাসিক ভাতা ৮৫০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, ভাতা ৫০ টাকা বাড়ানো আর সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানোতে কি সুরক্ষা আসবে? মাসে ভাতা যদি হয় ৬৫০ বা ৯০০ টাকা, দিনে ২০-৩০ টাকা, বাজারের হিসাবে এই টাকা দিয়ে কি কেনা সম্ভব? একজন ভিক্ষুক হাত পাতলে দিনে তুলতে পারে কম করে হলেও ৬০০ থেকে ১০০০ টাকা। তাহলে ভিক্ষা করা কি তার চেয়ে বড় সামাজিক সুরক্ষা নয়? যদিও ভিক্ষাবৃত্তি সামাজিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়, কিন্তু মাসে ভাতা ৭০০ বা ৮০০ টাকা দেওয়ার মধ্য দিয়ে কি দারিদ্র ঘুচবে? এতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কি লাভ হবে? এভাবে ভাতা প্রদানের মধ্য দিয়ে কি ভিক্ষাবৃত্তিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে না? ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়ালে কি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হ্রাস পাবে?

আমার মনে হয়, এক ভুল পদ্ধতির মধ্য দিয়ে সামাজিক সুরক্ষানীতি করা হয়েছে। প্রতিবছর একই ভুল পথে হাঁটছে সরকার। বাজেটের নীতি হতে হবে সরল ও বোধ্যগম্য। যেন সচ্ছলদের টাকা দিয়ে সচ্ছল আর অসচ্ছল সবাই চলতে পারে। মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তদের কাছ থেকে উত্তোলিত কর আর ভ্যাট দিয়ে গরিবের চলার ব্যবস্থা করবে সরকার। সঙ্গে তো উন্নয়নমূলক কর্মসূচি থাকবেই। মধ্যবিত্ত কারা? যাদের করযোগ্য আয় আছে তাদেরকে মধ্যবিত্ত ধরা যেতে পারে। উচ্চবিত্ত কারা? যারা শিল্পের মালিক, যারা ব্যাংকের মালিক বা এই ধরনের। উচ্চবিত্তের কাছ থেকে করপোরেট করের হার হতে হবে মধ্যবিত্তের তুলনায় বেশি। তাহলে যারা বেকার, শ্রমিক, দরিদ্র বিধবা, প্রতিবন্ধী, দরিদ্র এতিম তাদের জন্য সুস্পষ্ট সুবিধা কী? অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যারা আয় করছে, তাদের মধ্যে অনেকের আয় উপার্জন ভঙ্গুর ও অস্থায়ী। তাদের সুরক্ষায় কী ব্যবস্থা আছে?

যারা শিল্পকারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করে তাদের জন্য দরকার সরকারি অনুমোদিত শ্রম কার্ড; যারা মাঠে কৃষি কাজ করে তাদের জন্য দরকার কৃষি কার্ড, যারা দুর্যোগকবলিত হয়ে শহরে এসেছে বা গ্রামে থাকছে— তাদের জন্য দরকার ক্লাইমেট কার্ড; যারা রিক্সাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর তাদের জন্য অস্থায়ী শ্রম কার্ড, যারা এতিম ও বিধবা তাদের জন্য আশ্রয় কার্ড-এর ব্যবস্থা থাকা দরকার। এই কার্ড বিতরণের জন্য ‘সামাজিক সুরক্ষা অধিদপ্তর’ নামক সরকারি প্রতিষ্ঠান থাকা প্রয়োজন। এই প্রতিষ্ঠানের থানাভিত্তিক শাখা থাকবে। কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানে থাকবে গবেষণা সেল। গবেষণায় কোন মাপকাঠিতে কারা দরিদ্র, কারা বেকার, কারা এতিম, কারা ক্লাইমেট রিফিউজিতা শনাক্ত করা হবে। কারা কোন কার্ড পাবে বা পাওয়ার যোগ্য- তা প্রমাণ সাপেক্ষে বিতরণ করা হবে। কার্ড বিতরণ হবে থানাভিত্তিক। ডাটাবেস তৈরি করে তার আলোকে কার্ড প্রদান করতে হবে।

স্থানীয় প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ প্রতিবছর আপডেট করতে হবে। যারা বেকারভাতা পাওয়ার যোগ্য তাদেরকে বেকারভাতা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিতে হবে। কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হবে সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা পদ্ধতি। এবারের বাজেটে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ এতটাই গুরুত্বহীন হয়েছে যে, এতে করে সামাজিক সুরক্ষা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। শুধু তাই নয়, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল থেকে কর ধার্য করা হয়েছে, যা বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বেকারদের কীভাবে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা যায়, সেজন্য ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। অনলাইনে ব্যবসা করার সাপোর্ট দিতে হবে। উদ্যোক্তা হয়ে উঠলে বা কোনো কাজ পেলে বেকারভাতা বন্ধ করে দিতে হবে। হতদরিদ্রদের কাজ পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এমনভাবে ভাতা দিতে হবে, যেন তারা নিজেদের আয়ের ব্যবস্থা করতে পারে। ভাতাধারীদের ভাতা এক বা দুই বছরের জন্য হতে পারে, যে ভাতা খাটিয়ে স্বাবলম্বী হতে পারে। তাহলে তারা তাড়াতাড়ি কাজের খোঁজে থাকবে। অন্যান্য কার্ডধারীদের জন্য থাকতে হবে স্বাস্থ্যসুবিধা, শিক্ষাসুবিধা ও রেশনসুবিধা। তারা কার্ড দেখালে হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও মেডিসিন পাবে, সরকারি স্কুলে বেতন মওকুফ সুবিধা পাবে। তাদের কার্ড থাকলে তাদের ভ্যাট দিতে হবে না। এই পদ্ধতি চালু করলে সামাজিক সুরক্ষা বজায় থাকবে।

সে জন্য স্থানীয় সরকারকে দুর্নীতি থেকে অনেক দূরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয় সরকারকে দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচনের পদ্ধতি বাতিল করলে দুর্নীতি কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন কার্ড বিতরণে স্বচ্ছতা আসতে পারে। কর আদায়ের ব্যবস্থাকে সহজসাধ্য করতে পারলে, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের কাছ থেকে সঠিকভাবে কর আদায় করতে পারলে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে, আর দুর্নীতি কমিয়ে আনতে পারলে সামাজিক সুরক্ষানীতি বাস্তবায়ন করা আরও সম্ভবপর হবে।


ড. আশেক মাহমুদ : সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা