উচ্চশিক্ষায় খাদ্য প্রকৌশল পড়াশোনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
০৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০০:০০
শেয়ার :
উচ্চশিক্ষায় খাদ্য প্রকৌশল পড়াশোনা

* বিষয়ভিত্তিক চাকরির বাজার এবং এই বিভাগে পড়াশোনা সম্পন্ন করা ছাত্রছাত্রীদের বর্তমান অবস্থা। * চাকরি না পেলেও বিদেশে বৃত্তি ও পড়াশোনার জ্ঞান কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ আছে কিনা। * উক্ত বিভাগের শিক্ষকমণ্ডলীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা (কতজন ডক্টরেট ডিগ্রি), গবেষণাপত্র ও বাস্তব অভিজ্ঞতা। * উক্ত বিভাগের সুযোগ-সুবিধা। বিশেষ করে গবেষণায় সুবিধা ও একাডেমিক কাজকর্মে। * সর্বোপরি বিভাগের শিক্ষকমণ্ডলী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিকতা ইত্যাদি।

আসছে উচ্চশিক্ষা ভর্তিযুদ্ধ, ভর্তিচ্ছু ছাত্র-ছাত্রীরা সবসময়ই একটি ব্যাপার নিয়ে বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকেন, যা হলো বিষয় নির্বাচন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন আর একজনকে দেখে বিচার-বিশ্লেষণ না করেই বিষয় নির্বাচন করে থাকেন। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবমুখী নতুন নতুন বিভাগ চালু করে। দেখা যায়, সঠিক তথ্য না জানার কারণে সুযোগ পেয়েও এসব বাস্তবমুখী বিষয় শিক্ষার্থীদের আড়ালে চলে যায়। আপনি যে বিষয় নির্বাচন করতে চাচ্ছেন, পড়াশোনা শেষে সেই বিষয়ের চাহিদা ও প্রতিযোগীর সংখ্যা কেমন হতে পারে, তা আগে থেকেই ভাবা উচিত। পড়াশোনার অন্য বিভাগগুলোর মধ্যে বর্তমানে চাহিদাসম্পন্ন একটি বিভাগ হলো খাদ্য প্রকৌশল ও পুষ্টি বিজ্ঞান। বিভাগটি নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন সাবেক সিনিয়র গবেষক, জি এন ইউ, দক্ষিণ কোরিয়া ও স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের খাদ্য প্রকৌশল ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. মুহাম্মদ শফিউর রহমান

আপনি যখন ভর্তি হচ্ছেন, তখনকার চাহিদার চেয়ে আপনি যখন পড়াশুনা শেষ করে বের হবেন, ওই বিষয়ের তখনকার চাহিদা এবং প্রতিযোগিতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় দেখা যায়, আমি এটা হব, ওটা হব স্বপ্ন নিয়ে জোয়ারের স্রোতের মতোই লাখ লাখ ছাত্রছাত্রী জেনে না জেনে একই বিষয় নির্বাচন করে থাকেন। পড়াশুনা শেষে দেখা যায়, পদবিহীন সার্টিফিকেটধারী পদবি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কারণ লাখ লাখ প্রতিযোগীদের মধ্যে নিজেকে কাক্সিক্ষত অবস্থানে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৬ ভাগ ছাত্রছাত্রী বেকার থেকে যাচ্ছেন। যাই হোক, বিভাগ নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি তা হলো-

খাদ্য প্রকৌশল বিভাগে যে বিষয়গুলো পড়ানো হয়

ফুড ইঞ্জিনিয়ারিংকে বলা হয় একটি ‘মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি’ প্রোগ্রাম; অর্থাৎ আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যার প্রায় সব অঙ্গনেরই কিছু না কিছু পড়াশোনা এখানে জরুরি। উদাহরণস্বরূপ স্নাতকের বিভিন্ন বর্ষে একজন ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীকে স্ট্রাকচারাল, ইলেকট্রিক্যাল, কম্পিউটার সায়েন্স, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতি কোর্স সম্পন্ন করতে হয়। আর বিভাগীয় কোর্সের মধ্যে প্রধান হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে ফুড প্রসেসিং অ্যান্ড প্রিজারভেশন, ফুড কেমিস্ট্রি, বায়োকেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ফুড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল মাইক্রোবায়োলজি, প্রসেস ডিজাইন, ফুড সেফটি ম্যানেজমেন্ট, কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স ইত্যাদি। এ ছাড়া স্নাতক শেষ বর্ষে বাধ্যতামূলকভাবে একটি রিসার্চ প্রজেক্ট এবং একটি ইন্টার্নশিপ অথবা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং সম্পন্ন করতে হয়।

চাহিদা বেড়েছে বহু গুণ

চাকরির বাজারের ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশে হাজার হাজার খাদ্যশিল্প ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, FAO, FDA, WHO, UNDP, UNICEF ও অন্যান্য দেশীয়/আন্তর্জাতিক সংস্থায় উচ্চ বেতনে চাকরির সুযোগ রয়েছে। সম্প্রতি মহামারীর সময় থেকে আগের তুলনায় খাদ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোর (খাদ্য বিজ্ঞান/প্রযুক্তি/প্রকৌশল/পুষ্টি) চাহিদা বেড়েছে বহু গুণ। সে সময় প্রায় সব ধরনের প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও, অসংখ্য মানুষ চাকরি হারালেও চালু ছিল দেশ/বিদেশের সব খাদ্যশিল্প প্রতিষ্ঠান এবং একজন খাদ্য প্রযুক্তিবিদ/প্রকৌশলীও চাকরিচ্যুত হয়নি। মানুষ বুঝতে পেরেছে সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনের জন্য পুষ্টিবিদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের গুরুত্ব। সাধারণ বিসিএসসহ অন্যান্য সরকারি চাকরি যেমন- নিরাপদ খাদ্য অফিসার, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে সাইন্স ল্যাব, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বারি, বিরি, বারটান, ভিএলআরআই এবং বিএসটিআইতে মাননিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাসহ অন্যান্য পদে সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে জেলা নিরাপদ খাদ্য অফিসার পদটি চালু হয়েছে এবং থানা পর্যায়ে চালু করার জন্য প্রক্রিয়াধীন। এ ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিক কলেজসহ বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার সুযোগ রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রতিটি ৫০ বা তার অধিক হাসপাতাল/ক্লিনিকগুলোতে একজন করে পুষ্টিবিদ নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। আছে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য অসংখ্য বৃত্তি। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য প্রতিনিয়ত আন্দোলন করে যাচ্ছে এবং কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বরাদ্দ দিচ্ছে। এই বিষয়ের বিশেষ সুবিধা হচ্ছে- সনদধারী কিছু গ্র্যাজুয়েট থাকলেও চাকরির বাজারে চাহিদার তুলনায় দক্ষ জনশক্তির অনেক অভাব। তাই জোয়ারের স্রোতের মতো যে কোনো বিষয়ে সনদধারী শিক্ষিত বেকার না হয়ে বহুমুখী কর্মক্ষেত্র এবং ভবিষ্যতের অপার সম্ভাবনা সমৃদ্ধ আপনার বিষয় হতে পারে খাদ্য প্রকৌশল ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ।

দ্বিমুখী ক্যারিয়ারের সুযোগ

বর্তমান ও আগামীর চাহিদাসম্পন্ন এ রকম একটি বিভাগ হতে পারে খাদ্য প্রকৌশল ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ। যার রয়েছে খাদ্য প্রকৌশলী বা পুষ্টিবিদ হিসেবে দ্বিমুখী ক্যারিয়ারের সুযোগ। অনেকের ধারণা খাদ্য বিজ্ঞান/প্রকৌশল/পুষ্টি বিষয় মানেই রান্নাবান্না, যা পুরোটাই তাদের অনভিজ্ঞতার পরিচয়। খাদ্যশিল্প সারাবিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি শিল্প, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন প্রকার পানীয় যেমনÑ কোকাকোলা, সেভেনআপ, স্প্রাইট, চা, কফি, বোতলজাত পানি, পাস্তুরিত তরল ও গুঁড়া দুধ, তেল, চকলেট, বিস্কুট, বেকারি শিল্প, বিভিন্ন বায়োবর্জ্য কাজে লাগানো ও পরিশোধন বাবস্থাপনা ইত্যাদি। একটি খাদ্য শিল্পের শুরু থেকে সঠিক জায়গা নির্ধারণ, কারখানা লে-আউট ও ডিজাইন, মেশিন নির্ধারণ ও স্থাপন, অপারেশন, পণ্য প্রণয়ন ও উৎপাদন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্যের উদ্ভাবন, দীর্ঘদিন নিরাপদ ও গুণগত মান বজায় রাখা, মোড়কীকরণ, বিভিন্ন সম্মতি/আদর্শমান যেমনÑ বিএসটিআই, হেসাপ, কডেক্স, হালাল, জিএমপি ইত্যাদিসহ সমস্ত কারিগরি দক্ষতাই স্টেট ইউনিভার্সিটির খাদ্য বিজ্ঞান/প্রকৌশল বিভাগ থেকে শেখানো হয়। এ ছাড়াও একটি খাদ্যদ্রব্যের সমস্ত জৈবরাসায়নিক উপাদান ও তাদের বৈশিষ্ট্য, গঠন, কাজ, মানবদেহের জন্য স্বাস্থ্যকর/ক্ষতিকর কিনা ইত্যাদি সমস্ত বিষয় নিয়েই গবেষণা করা হয়। অন্যদিকে পুষ্টিবিদ হিসেবে হাসপাতাল/ক্লিনিক, নিজস্ব চেম্বারসহ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ রয়েছে। গবেষণায় ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্য বিশ্লেষণাত্মক যন্ত্রপাতিগুলোর মধ্যে ক্রোমাটোগ্রাফি বিশেষ করে HPLC, GC-MS I UPLC-Q-TOF-MS. এ ছাড়াও UV-spectrophotometer, calorimeter, Atomic absorption, FT-IR, Raman Spectroscopy, SEM, CLSM, DSC, Particle Size Analyzer, Texture Analyzer, Microplate Reader, Electronic Tongue ইত্যাদি। প্রক্রিয়াজাতকরণ মেশিনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বিভিন্ন প্রকার dryers, coolers, chiller, mixture, filter, pasteurizer, homogenizer, HPP, Extractors, Packaging machine, Molder, Oven, Cutter, Filler, Boiler, ইড়রষবৎ ইত্যাদি।

যে বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে রয়েছে খাদ্য প্রকৌশল বিভাগ

১৯৬৪ সালে বাংলাদেশে ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড রুরাল ইন্ডাস্ট্রিজ বিভাগে ‘ফুড টেকনোলজি’ নামক মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালু করার মাধ্যমে। ২০০২ সালে দেশের প্রথম ‘বিএসসি ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং’ স্নাতক প্রোগ্রামে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করে। যুগের চাহিদায় একে একে ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং অন্যান্য সামঞ্জস্যপূর্ণ নামে দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ডিগ্রি প্রদান শুরু করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ফুড অ্যান্ড প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং), ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং), শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি), চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি), যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (অ্যাগ্রো প্রসেস অ্যান্ড ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং) ইত্যাদি। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, জার্মান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি দিয়ে থাকে।