চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তি ব্যবহার অন্তর্ভুক্তকরণ জরুরি
বর্তমান প্রযুক্তির যুগে শিক্ষা, বিনোদন, অর্থ লেনদেন, দৈননন্দিন কেনাকাটায় যেমন প্রযুক্তি জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে, তেমনি চিকিৎসা খাতেও প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। বৈশ্বিক মানের চিকিৎসাসেবার জন্য প্রয়োজন বৈশ্বিক মানের প্রযুক্তি-ভিত্তিক চিকিৎসাব্যবস্থা। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থাও অগ্রসর হচ্ছে। তবে এই অগ্রগতিকে ধরে রাখতে প্রয়োজন চিকিৎসা খাতে প্রযুক্তির ব্যবহারের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তকরণ।
আমাদের দেশে পর্যাপ্তসংখ্যক মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে, যা প্রশংসনীয়। এখন ফোকাস করতে হবে চিকিৎসার গুণগত মানের দিকে। নিশ্চিত করতে হবে, আমাদের চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থা বৈশ্বিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আমরা মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের যোগ্য করার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার সাথে গড়ে তুলছি। আমাদের পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, অ্যাক্রিডিটেশন, অনুষদ উন্নয়ন এবং ডিজিটালি রূপান্তর করতে হবে।
চিকিৎসা শিক্ষার চ্যালেঞ্জগুলো যেমন- পরিবর্তিত স্বাস্থ্যসেবা পরিবেশ, চিকিৎসা পরিচর্যার চিরাচরিত হাসপাতাল ব্যবস্থা থেকে অ্যাম্বুলারি মেডিসিনে পরিবর্তন, দ্রুত সময়ের মধ্যে সেবা প্রদানের সক্ষমতা অর্জন এবং হেলথ হিস্টরি ও মেডিক্যাল রেকর্ডসহ সব তথ্য ডকুমেন্টেশনে পরিবর্তন প্রয়োজন।
প্রতিনিয়তই চিকিৎসা, শিক্ষায়, প্রযুক্তির ব্যবহার বিকাশ লাভ করছে। দক্ষ চিকিৎসক তৈরি এবং নতুন নতুন রোগের কারণ অনুসন্ধান ও চিকিৎসায় নতুন ডিভাইস যেমন দরকার, তেমনি সেই ডিভাইস ব্যবহারে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের অভ্যস্ত করাও জরুরি। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে যেমন চিকিৎসা ব্যাহত হয়, আবার যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল ও পরিচালনার অভাবে পড়ে থাকার নজিরও কম নয়।
চিকিৎসা শিক্ষায় প্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষগুলোর মধ্যে রয়েছে- মৌলিক জ্ঞান অর্জন, দ্রুত এবং নির্ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দক্ষতা সমন্বয়, বিরল বা ক্রিটিক্যাল ইভেন্টগুলোর জন্য অনুশীলন, দলগত প্রশিক্ষণ এবং সাইকোমোটর দক্ষতার উন্নতি। বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করা যেতে পারে। চিকিৎসা শিক্ষাবিদদের কাজ হলো এই নতুন প্রযুক্তিগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করে শিক্ষাপদ্ধতিকে আরও সহযোগিতামূলক, ব্যক্তিগতকৃত এবং গতিশীল করা। একটি দেশের স্বাস্থ্য খাত যত বেশি প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত, স্বাস্থ্য সুবিধার মান তত উন্নত। তবে বাংলাদেশ যখন ডিজিটালাইজড স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে একটি স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে অগ্রসরমান, তখনো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় আইসিটি বাস্তবায়নে অপ্রভুলতা রয়েছে। যেমনÑ ডাক্তাররা এখনও রোগীদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অ্যাকসেস করতে অসুবিধার সম্মুখীন হন কারণ এটি এখনো সঠিকভাবে ডিজিটালাইজ হয়নি। আর তাই স্বাস্থ্য খাতে রোগীর সঠিক সেবায় প্রযুক্তিগত উন্নয়নে দৃষ্টিপাত জরুরি। শুধু স্বাস্থ্যখাতই নয়, নজর দিতে হবে রোগীর সুবিধা-অসুবিধার দিকেও। দেশ ও সমাজের অগ্রগতিতে নানাভাবে ভূমিকা রাখতে এগিয়ে আসতে হবে চিকিৎসকদের এবং এর সাথে জড়িত সরকারী বেসরকারি হাসপাতালগুলোর।
আরও পড়ুন:
বৈষম্যের ছোবলে নারীর শ্রমবাজার
আমাদের দেশের ক্রান্তিকালীন সময়ে যেমন কোভিড-১৯ মহামারি এবং ডেঙ্গ মোকাবিলায় দেশের বেশকিছু বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল সফলভাবে সেবা দিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বেসরকারি হাসপাতাল ও মেডিক্যালও কলেজগুলো এখন তাদের চিকিৎসা সেবায় এবং শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার করেছে। ডিজিটালাইজেশন আনয়ন করেছে। আমাদের দেশের বেসরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালগুলো বর্তমানে অবকাঠামোতে বিনিয়োগ, পাঠ্যক্রম আপডেট করা, অনুষদের গুণমান উন্নত করা, গবেষণার সুযোগ বাড়ানো এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী করার দিকে জোর দিচ্ছে। এসব কাজকে অপরিহার্য পদক্ষেপ বলে মনে করছে এবং এই নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
এসব কিছু বিবেচনায় রেখে এবং বর্তমান স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা মেটাতে ইউনাইটেড হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরি করছে যেখানে সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং জরুরি বিভাগে একটি ভূল ফাংশনাল অপারেশন থিয়েটার থাকবে। এ ছাড়া রোগীর স্বজনদের প্রাথমিক মানসিক সাপোর্ট ও সিচুয়েশন টেকেলের জন্য প্যানিক ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও রাখা হবে। হাসপাতালের প্রত্যেকটি শয্যা মূলত সিপিআর (কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন) মডেলে তৈরি। হাসপাতালটিতে কার্ডিয়াক অপরেশন থিয়েটার, ক্যাথল্যাব, প্রি-ল্যাব, পোস্ট ল্যাব সবই থাকবে। এখানে সব শ্রেণির মানুষকে বিশেষত নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বল্পমূল্যে সেবা দেয়া হবে।
তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো স্বাস্থ্যসেবা কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের অভাব। এখনো খুব কম হাসপাতালেই রোগীর প্রেসক্রিপশন সংরক্ষণের জন্য একটি ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা আছে। স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তিই কম্পিউটার বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস সংশ্লিষ্ট কাজে প্রশিক্ষিত। যে কারণে অনেক ক্ষেত্রে সঠিক রোগ নির্ণয় বাধাগ্রস্ত হয়। তাই মেডিক্যাল স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে। যাদের হাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরার দায়িত্ব, তাদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে বাস্তবসম্মত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও বিজ্ঞানভিত্তিক কোর্সগুলো হাতেকলমে শেখানো জরুরি।
ডিজিটাল টুলস ও প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তার চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ এবং ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা নিশ্চিত করতে পারে। চিকিৎসা শিক্ষার অগ্রগতি শুধু বর্তমান সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার জন্য নয়, টেকসই স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি তৈরির জন্য আবশ্যক।
আরও পড়ুন:
ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন মানবজাতি
পরিশেষে বলা যায়, যুগের চাহিদা অনুযায়ী বৈশ্বিক মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এসব প্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিকল্প নেই।
ডা. মো. আরমান জাহেদ বসুনীয়া
সহকারী মহাব্যবস্থাপক
আরও পড়ুন:
রহস্যে ঘেরা এক অসম যুদ্ধ!
মেডিক্যাল সার্ভিসেস
ইউনাইটেড হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড