বিশ্ব পরিবেশ দিবসে একটি নাগরিক নিবেদন
বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের মানুষ ও পরিবেশ নিয়ে অনুষ্ঠিত স্টকহোম কনফারেন্সে। এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্ব সম্প্রদায়কে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে উদ্বুদ্ধ করতে উদ্যোগ নিয়েছিল। এই সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৭৩ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ জুন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পরিবেশ দিবস পালিত হয়ে আসছে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীর সব দেশ এবং তাদের নাগরিকদেরকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়া এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার সামগ্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত ১৯৭২ সালে হয়ে থাকলেও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব পায় ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী সম্মেলনের পর থেকে। ধরিত্রী সম্মেলনের পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশ দিবস পালন করে থাকে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ ও স্থানীয় জনসাধারণও যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে এই দিবসটি পালন করে থাকে। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ দিবস পালনের জন্য প্রতি বছর জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক প্রতিষ্ঠান একটি প্রতিপাদ্য বিষয় নির্বাচন করে থাকে। প্রতিপাদ্য বিষয় নির্বাচন করার ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে পরিবেশের জন্য সবচেয়ে আলোচিত এবং প্রয়োজনীয় বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। যাতে ওই বিষয়টি নিয়ে সরকার, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠান গুরুত্ব সহকারে কার্যক্রম গ্রহণ করে।
জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক প্রতিষ্ঠান এ বছরের প্রতিপাদ্য হিসেবে ‘করব ভূমি পুনরুদ্ধার, রুখবো মরুময়তা, অর্জন করতে হবে মোদের খরা সহনশীলতা’ এ বিষয়টি নির্বাচন করেছে। এই প্রতিপাদ্য বিষয়টি মূলত ভূমির দূষণ নিয়ন্ত্রণ, উর্বরতা বৃদ্ধি, মরুময়তা রোধ করা এবং জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাব থেকে ভূমিকে মুক্ত করার মাধ্যমে ভূমির সহনশীলতা বৃদ্ধি করা। একই সঙ্গে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের স্লোগান হিসেবে আমাদের ভূমি, আমাদের ভবিষ্যৎ, আমরা নিয়োজিত প্রজন্মান্তরের সহনশীলতায়।
বর্তমান সময়ে ভূমি দূষণ সমগ্র বিশ্বে তো বটেই বাংলাদেশও এক উদ্বেগজনক অবস্থায় উপনীত হয়েছে। এষড়নধষ ঊহারৎড়হসবহঃ ঋধপরষরঃু (এঊঋ) তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীর ২৫ ভাগ ভূমি এখন দূষণের ভয়াবহ সমস্যার মধ্যে আছে। দূষণের কারণে প্রতি বছর ২৪ বিলিয়ন টন উর্বর মাটি দূষিত হচ্ছে এবং এই মাটি ফসল উৎপাদন করার তালিকা থেকে বাদ পড়ছে। যদি এই অবস্থা চলতে থাকে তবে ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর প্রায় ৯৫ ভাগ উর্বর ভূমি দূষিত হয়ে যাবে। এই ভূমি দূষণের কারণে পৃথিবীর ৩২০ কোটি মানুষ বিশেষ করে গ্রামীণ জনগণ, প্রান্তিক চাষি ও দরিদ্র মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। ভূমি দূষণের কারণে একদিকে যেমন ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে তেমনি মাটি থেকে কার্বন এবং নাইট্রাস অক্সাইড নির্গত হয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রার ক্রমাগত বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। যার ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব আরও প্রকট হচ্ছে।
বাংলাদেশের ভূমি দূষণ এবং ভূমির ব্যবহার পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাব নিয়ে ২০২০ সালে প্রকাশিত যে তথ্য-উপাত্ত আছে তা থেকে দেখা যায় ৩.০৮ মিলিয়ন হেক্টর মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত, ১২.৬৮ মিলিয়ন হেক্টর খুবই ক্ষতিগ্রস্ত এবং ১৫.৬৩ হেক্টর মধ্যম পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি থেকে মাটির জৈব পদার্থ ও উর্বরতা কমে গেছে। ফলে আমাদের ভূমি ফসল উৎপাদনের আশানুরূপ ফলন দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূমির শ্রেণি এবং ব্যবহার পরিবর্তন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০১২ সাল পর্যন্ত ২৫৭৭০ স্কয়ার কিলোমিটার বন উজাড় হয়েছে। নদী ভাঙন, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, অম্লতা বৃদ্ধি এবং কলকারখানা থেকে নির্গত দূষণকারী পদার্থ আমাদের ভূমির উর্বরতা এবং উৎপাদনশীলতা দুটোই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
আমাদের অত্যধিক জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাষ পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হয়েছে। উচ্চ ফলনশীল ধানের চাষের জন্য হাইব্রিড বীজ, মাত্রাতিরিক্ত অজৈব সার, কীটনাশক এবং অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য নিবিড় চাষ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হচ্ছে। যে কারণে মাটি থেকে ফসফরাস, পটাসিয়াম, জিং, মলিবডেনাম, বোরন ইত্যাদি কমে যাচ্ছে। ফলে মাটি তার স্বাভাবিক পুষ্টিগুণ হারাচ্ছে। যে কারণে কৃষককে ফসল উৎপাদনের জন্য অতিরিক্ত অজৈব সার ব্যবহার করতে বাধ্য করছে। আপাতদৃষ্টিতে কৃষির সাফল্য অর্জন নিয়ে ইতিবাচক চর্চা হলেও বর্তমান চাষ পদ্ধতির জন্য পরিবেশের কতটুকু দূষণ এবং বিপর্যয় হয়েছে এবং হচ্ছে তার কোনো হিসাব করা হচ্ছে না। যে কারণে আমাদের নদনদী, খালবিল, হাওর-বাঁওড় এখন মাছশূন্য হয়ে পড়েছে। অনেক মিঠা পানির মাছ বিলুপ্তির পথে। আমাদের মাটি দূষিত হওয়ার অন্যতম কারণ যত্রতত্র কলকারখানা স্থাপন এবং কলকারখানার বর্জ্য কোনো পরিশোধন ছাড়াই প্রকৃতিতে নির্গত করা। সত্যিকার অর্থে আমাদের কলকারখানা টেকসই উন্নয়নের ধারণাকে মননে ধারণ না করেই যত্রতত্র গড়ে উঠেছে। কলকারখানার বর্জ্য থেকে দূষণ নিয়ন্ত্রণের আইন থাকলেও কলকারখানা পরিচালনাকারীগণ তার তোয়াক্কা করেন না। এর মূল কারণ কলকারখানার মালিকগণ একদিকে ব্যবসায়ী, অন্যদিকে পরাক্রমশালী রাজনীতিবিদ। যে কারণে কলকারখানার দূষণ কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
আরও পড়ুন:
বৈষম্যের ছোবলে নারীর শ্রমবাজার
ভূমির দূষণের জন্য অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রতি বছর কৃষি জমি বৃদ্ধি ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজতর করার জন্য রাস্তা নির্মাণও দায়ী। পরিবেশ দূষণের চিত্র এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশের সব এলাকার ভূমিই এখন কম-বেশি দূষিত। যা আমাদের সবার সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য হুমকি হয়ে আছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১৯ সালে ভূমির ক্ষয়রোধে নিরপেক্ষ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ২০৩০ সাল পর্যন্ত কর্মসূচির প্রণয়ন করে। ওই প্রতিবেদনে ভূমির দূষণ, মরুময়তা রোধ, ভবিষ্যতের জন্য করণীয় ইত্যাদি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে নিম্নের বিষয়ে কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করার জন্য সব অংশীদারদেরকে আহ্বান করা হয়েছে।
১. মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করা এবং ২০০০ স্কয়ার কিলোমিটার ফসলের জমিতে কার্বন স্টক করা।
২. ভূমির প্রাকৃতিক অবস্থা পরিবর্তন না করা এবং কমপক্ষে ৬০০ স্কয়ার কিলোমিটার বন এবং বনভূমির পরিবর্তন রোধ করা।
৩. কমপক্ষে ৬০০ স্কয়ার কিলোমিটার এলাকার জলাবদ্ধতা দূর করা।
আরও পড়ুন:
ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন মানবজাতি
৪. ৬০০ স্কয়ার কিলোমিটার পাহাড়ি এলাকার ভূমি ধস রোধ করা।
৫. লবণাক্ততা থেকে ভূমিকে রক্ষা করা এবং ১২০০ স্কয়ার কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় যেন লবণাক্ততা প্রবেশ করতে না পারে তা ব্যবস্থা করা।
৬. নদী ভাঙন থেকে প্রতি বছর ১০০ হেক্টর এলাকা রক্ষা করে ২০৩০-এর মধ্যে ১০০ স্কয়ার কিলোমিটার এলাকা রক্ষা করা।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস কেবল পালনের জন্য পালন এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়কে যথাযথ মূল্যায়ন করার জন্য ২০১৯ সালে ভূমির দূষণ রোধে প্রণীত কার্যক্রম কতটুকু বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং কতটুকু সাফল্য লাভ করেছে তার হিসাব নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করলে সত্যিকার অর্থেই পরিবেশ দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য সাধিত হবে।
পরিশেষে একটি নাগরিক নিবেদন করতে চাই সবার কাছে। আমাদের পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব আমাদের। পরিবেশকে দূষণ করার আগে একটু ভাবুন। আজকে আমি-আপনি যেভাবে পরিবেশ দূষণ করছি তা কিন্তু খুব সহসাই আমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এই ক্ষতি এড়ানোর কোনো বিকল্প পথ বা সুযোগ পাওয়া যাবে না। পৃথিবীর পরিবেশ দূষণের ইতিহাস তাই সাক্ষ্য দিচ্ছে। সুতরাং আমাদের দায়িত্ব হলো অনাগত প্রজন্মের জন্য একটি দূষণ মুক্ত বাংলাদেশ রেখে যাওয়া।
আরও পড়ুন:
রহস্যে ঘেরা এক অসম যুদ্ধ!
ড. মনজুরুল হান্নান খান : সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাহী পরিচালক, ন্যাচার কনভেনশনের ম্যানেজমেন্ট (নেকম)