আমাদের কেনাকাটা প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয়

আনোয়ারা আজাদ
০৭ এপ্রিল ২০২৪, ০০:০০
শেয়ার :
আমাদের কেনাকাটা প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয়

পণ্য বয়কটের মহোৎসবের সঙ্গে কম্পিটিশন দিয়ে চলছে আমাদের কেনাকাটা! আজকাল বাজারে গিয়ে এর ভাও বোঝা লাগে না, টিভি আর ফেসবুকে ঘণ্টাখানেক সময় দিলেই সব ক্লিয়ার! দৈনিক পত্রিকা পড়লেও চলে, না পড়লেও চলে! দৈনিক পত্রিকার আগেই ফেসবুকে সব খবর চলে আসে। বাংলাদেশের জাহাজ অপহরণের খবরটা পত্রিকায় বের হওয়ার আগেই পড়ে ফেলেছি! এ রকম আরও খবর যেগুলো আগেই জেনে যাই নানা মাধ্যম থেকে! আপাতত কে যে কী বয়কট করছে আর কী বয়কট করছে না, খবরে ধন্দে পড়ে গেছি! কারণ বাংলাদেশের মানুষ এখন আছে বয়কট করা নিয়ে! ফ্রান্স থেকে শুরু করে আপাতত এসে ঠেকেছে ‘যত দোষ নন্দঘোষ’ পাশের বাড়ি! ওদের কিন্তু কিচ্ছু যাবে আসবে না কারণ সারা পৃথিবীতে ওদের বাজার তৈরি হয়ে আছে। সেজন্যই তো আমাদের এতো কিছু পোড়াপুড়ির খবরেও ওরা নিস্পৃহ। বরং আরও বেশি নমনীয়।

বাংলাদেশের কচু-ওলকচু কোথায় পাওয়া যায় না? প্রবাসীরা বলুক, কোথায় পাওয়া যায় না। খেতে মন চাইলে বেশি দামে হলেও ঠিকই খুঁজে কিনে খায়! কচু পাওয়া গেলে বাকিগুলোর উল্লেখ না করলেও চলে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের পণ্য কোথা থেকে কোথায় চলে যাচ্ছে, কম আর বেশি কিন্তু যাচ্ছে-আসছে তো? এটা তো সত্যি, আগের পৃথিবী আর আগের জায়গায় বসে নেই, পৃথিবীর প্যাটার্ন বদলে গেছে, ইকোনমি বদলে গেছে। ইকোনমি নিয়েই রাজনীতি, ইকোনমি দিয়েই সব হিসাব-কিতাব! বাকি যতসব হাবিজাবি ইমোশনের কোনো মূল্য নেই। আইডোলজির মূল্য নেই। আমেরিকার কত নিষেধাজ্ঞা! এখন বাংলাদেশে ব্যবসার প্রতি ওদের নিবেদিত চোখ আমাদের স্বস্তি দিচ্ছে!

এখন কথা হচ্ছে, কোনটা আমাদের প্রয়োজনীয় আর কোনটা অপ্রয়োজনীয় সেটা বুঝে এগিয়ে যাওয়া। ঠিকাদারির মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় অনেক কিছুই আমাদের ঘাড়ে চেপে বসছে। জনগণ বুঝলেও কিছুই করতে পারছে না। কেন করতে পারছে না সেটা যদিও অনেকেই বোঝে, তারপরেও। এদিকে বয়কট করাকরির যতগুলো আইটেম আছে সবগুলোতেও লাগাম দেওয়া সাধারণ জনগণের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। বাজারে নানান দেশের আমদানি করা গুচ্ছের জিনিস পাওয়া যায়। কোনটা কোন জায়গার সব সময় দেখা সম্ভব হয় না। জনগণ দেখে দাম কত! তার ওপরই নির্ভর করে কেনাকাটা! দাম একটু কম পেলেই কিংবা হাতে কিছু টাকা থাকলেই মন কন্ট্রোল করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রয়োজন না থাকলেও ‘চলো কিনে ফেলি’ অবস্থা আমাদের। এদিকে এসব জিনিসের হয়তো প্রয়োজনই নেই। হ্যাঁ, আমরা যত কিনব যত ব্যবহার করব তত বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, মানুষজন কাজ করার জায়গা খুঁজে পাবে, সব ঠিক আছে কিন্তু অপ্রয়োজনীয় গুচ্ছের জিনিস কিনে ঘরে ফেলে রাখাও যৌক্তিক মনে করি না। কিন্তু হরহামেশা এটাই দেখা যায়।

আমার এক বান্ধবী বলল, বাড়ি সিফট করার সময় বড় দশ ব্যাগ শুধু শাড়িই সিফট করেছে! বাকিগুলোর সংখ্যা আর জানায়নি। জীবন-যাপনে এরকম অসংখ্য জিনিস আমরা কিনতে থাকি, কিনতেই থাকি। আমি নিশ্চিত এই শাড়িগুলোর মধ্যে ইন্ডিয়ান শাড়ি আশি ভাগ, পাকিস্তানি সালোয়ার-কামিজ পঞ্চাশভাগ, লন্ডন, জার্মান কিংবা কোরিয়ান কসমেটিকস আশিভাগ। কারণ বান্ধবীর আত্মীয়-স্বজনের দেওয়া ও তার মুভমেন্টই হিসাবটা বুঝিয়ে দেয়। বাংলাদেশে এখন যারা মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে অভিহিত তাদের অধিকাংশই এই হিসাবে চলে আসে। বাকি যারা নিম্নবিত্ত তারা বয়কট ফয়কট নিয়ে মাথাও ঘামায় না, বাড়তি জিনিসপাতি কেনার সামর্থ্যও রাখে না। তবে আমাদের সাহায্যকারিণীও এখন তার রোজগারের একটা বড় অংশ জামা-কাপড়ে খরচ করে বলে জানিয়েছে। এখন কথা হলো যাদের অনেক টাকা তারাই শুধু কেনে নাকি যাদের হিসাবের টাকা থাকে তারাও কেনে? আমার দেখা ও জানামতে হিসাবের বাইরেও মানুষের কেনার অভ্যেস আছে। জোশে জোশে কিনে কিংবা কম্পিটিশন দেওয়ার জন্য কিনে! ওটাই বেশি হয়। এই রিপুটা তাড়ানো না গেলে পৃথিবীতে বসবাস করে শান্তি আশা করা বৃথা! এদিকে কম্পিটিশন পিরিয়ডটা পার হলেই শুরু হয় ধারদেনা। অতঃপর সেই ধারদেনা শোধের বিষয়টি নিয়েই শুরু হয় কলহ। হ্যাঁ, দেখি এসব। আবার মা-বাবাদের এসব অভ্যাস দেখেই শিশুরা বড় হয়। বড় হয়ে ওই যে কীসব ড্রেস-ট্রেসের জন্য বায়না ধরে না পেলে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এসব খবর হঠাৎ করে আসে না, মাঝে মাঝেই আসে। আর উৎসবগুলোর আগে-পিছে দু’চারটা এরকম খবর থাকেই!

এই অতিরিক্ত জিনিসপাতি কিনে বেশিরভাগ মানুষই কিন্তু ব্যবহার করতে পারে না, ঘরের কোনায় ফেলে রাখে, এক সময় ফাঙ্গাশ পড়লে ফেলে দিতে হয়! এই যে ফেলে দেওয়ার ব্যাপারটি, এটি অর্থনীতির অপচয়। এর ইমপ্যাক্ট দেশের পুরো অর্থনীতিতেই পড়ে বলে আমার সাধারণ জ্ঞান বলে। যেগুলো পচনশীল সেগুলোর না হয় একটা ব্যবস্থা করা যায় সহজেই কিন্তু যেগুলো পচনশীল নয়, রিসাইকেলিং সহজলভ্য নয় সেগুলোর কথা ভাবতে হবে তো! আগে আমাদের একটি ফ্রিজ নষ্ট হলে আরেকটি কেনার কথা সহজে ভাবতে পারতাম না। এখন একজন মধ্যবিত্ত নষ্ট ফ্রিজ মেরামত করে চালাতে চায় না, নতুন কিনে নেয়। একেকজনের বাড়িতে ডিপ ফ্রিজসহ কমপক্ষে তিনটে করে ফ্রিজ। দুটো হলেই কিন্তু হয়ে যাওয়ার কথা সেখানে অনেক বাড়িতেই তিনটে ফ্রিজ। শাড়ি, জামা কাপড় ইত্যাদির সংখ্যা এখন চট করে আমরা বলতে পারি না! উচ্চবিত্তরা অপচয় করে জানি কিন্তু মধ্যবিত্তরাও কম অপচয় করে না। খাওয়া-দাওয়া, কাপড়-চোপড় কিংবা ঘর সংসারের জিনিস কেনাকাটায় প্রচুর অর্থ ব্যয় করি আমরা। খুব দ্রুত এই প্র্যাকটিস গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে। এই বিষয়ে একটু সচেতন হওয়া জরুরি, একটু ভাবা জরুরি।

আনোয়ারা আজাদ : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক