হাতের নগদ অর্থ কমছে, বাড়ছে ব্যাংকে আমানত
অর্থবছরের প্রথম ৩ মাস
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশের ব্যাংক খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। এ সময়ে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ কমেছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এতে ব্যাংক খাতে তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তবে ঋণ বিতরণে গতি না ফেরায় বিনিয়োগে মন্থরতা চলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পদক্ষেপে আস্থা ফিরতে শুরু করা, নির্বাচনী অনিশ্চয়তা দূর হওয়া, মূল্যস্ফীতি কিছুটা হ্রাস পাওয়া এবং আমানতের সুদহার বাড়ায় মানুষ আবার ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে আগ্রহী হচ্ছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে নানা অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট ছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তা সামনে আসায় বেশ কয়েকটি ব্যাংকের প্রতি এ সংকট তীব্র হয়েছিল। ফলে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে হাতে রাখার প্রবণতা দেখা দেয়। তবে সুদের হার বৃদ্ধিসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কারমূলক নানা পদক্ষেপে সংকট কাটতে শুরু করেছে। ঘরের টাকা আবার ব্যাংকে ফিরছে। সেই সঙ্গে নির্বাচনী অনিশ্চয়তা দূর হওয়া, মূল্যস্ফীতি কিছুটা হ্রাস পাওয়া এবং আমানতের সুদহার
বাড়ায় ব্যাংকে আমানত বাড়ছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগে ঝুঁঁকি না নিয়ে ব্যাংকে টাকা রাখাকে নিরাপদ মনে করছেন অনেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগের এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ কমা এবং আমানত বৃদ্ধি পাওয়া বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে গ্রাহকের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে, অর্থনীতির চাপ কমছে এবং নীতিগত পদক্ষেপগুলো ফল দিতে শুরু করেছে।
আরও পড়ুন:
একে আবদুল মোমেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ‘কারেন্সি আউটসাইড ব্যাংক’ বা ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ কমেছে প্রায় ২১ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসেই কমেছে প্রায় ১ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই পরিমাণ টাকা গত তিন মাসে ব্যাংকে ফিরে এসেছে, যা আমানতের প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। গত অর্থবছরের জুন শেষে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। সেটি কমে চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা। এর আগে গত মে ও জুন মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়েছিল প্রায় ১৯ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে কোরবানির ঈদের কারণে মে মাসে ১৬ হাজার ৪১২ কোটি টাকা ও জুন মাসে ২ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা বাড়ে। এ ছাড়া রোজার ঈদের কারণে গত মার্চ মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বেড়েছিল প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। তবে এপ্রিলে মাসে আবার ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ কমেছিল প্রায় ১৯ হাজার ৬৫ কোটি টাকা।
একই সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকের আমানত বেড়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। সেটি সেপ্টেম্বর শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ১৪ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে প্রায় ৩৪ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসেই বেড়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। আর গত এক বছরে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা বা ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে হাতে রেখেছিলেন। এ ছাড়া কিছু ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠনের প্রভাবও পড়েছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা উদ্যোগে আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। সুদের হার বাড়ায় নতুন আমানতও আসছে। যদিও তা খুব বেশি নয়, কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব বাড়ায় মানুষের সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমেছে।
সরকারি তথ্য চলছে, দীর্ঘদিন ধরেই দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছিল। তবে চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অথচ গত অর্থবছরেরর ১২ মাসে গড়ে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ।
শুধু মূল্যস্ফীতি কমার সঙ্গে আমানতের সুদের হার বাড়ায় গ্রাহকদের ব্যাংকে টাকা রাখার আগ্রহ বেড়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, অনেক ব্যাংক এখন স্থায়ী আমানতের বিপরীতে ৯ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে। সরকারি ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি অধিকাংশ ব্যাংকই এ তালিকায় রয়েছে। তবে সার্বিক ব্যাংক খাতে আমানতের গড় সুদের হার এখনও ৬ শতাংশের ঘরে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংক খাতে আমানতের গড় সুদের হার বেড়ে হয়েছে ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ। এটি গত জুনেও ছিল ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ।
তবে ব্যাংক খাতে আমানত বাড়লেও বেসরকারি ঋণে চলছে মন্থরতা। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, গত বছরের জুলাইয়ে বেসরকারি খাতের ঋণে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। সেটি কমতে কমতে গত জুনে নেমে আসে ৬ দশমিক ৪৫ শতাংশে। তবে চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে এই প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে হয় ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। তবে গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে তা আরও নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে। গত আগস্টে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয় ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আর সেপ্টেম্বরে হয়েছে ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
আরও পড়ুন:
পাল্টে যেতে পারে আন্দোলনের ধরন