সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে বড় ধাক্কা
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে বড় ধাক্কা লেগেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৭৩ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ২২ গুণ কম। সবমিলে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি কমেছে প্রায় ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষ আগের মতো আর সঞ্চয়পত্র কিনছেন না, বরং অনেকেই পুরনো সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষে অর্থ তুলে নিচ্ছেন। এর পেছনে ৩টি কারণকে দায়ী করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। প্রথমত, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার খরচ বাড়ায় সাধারণ মানুষের হাতে সঞ্চয়ের মতো অতিরিক্ত অর্থ থাকছে না। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ঋণের সুদহার বৃদ্ধির কারণে আমানতের সুদের হারও বেড়েছে। ফলে অনেকেই ব্যাংকে টাকা রাখতে উৎসাহিত হচ্ছেন। অন্য কারণ হলো- সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার বেশ কয়েক মাস ধরে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ছিল। ফলে সেখানেও বিনিয়োগ স্থানান্তরিত হয়েছে।
সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগ সরকারের ঋণ হিসেবে গণ্য হয় এবং তা বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ব্যবহার করা হয়। চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল রেকর্ড ৮ হাজার ৩৩২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সেখানে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে নিট বিক্রি হয়েছে মাত্র ৩৭৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। আগের মাস আগস্টে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল আরও কম, ২৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। অথচ গত বছরের আগস্টে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া গত জুলাইয়ে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৬৯ শতাংশ কম। সবমিলে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সঞ্চয়পত্রে নিট বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে নিট বিক্রি হয়েছিল ৪ হাজার ১০৯ কোটি টাকা। ফলে এবার নিট বিক্রি কমেছে প্রায় ৫২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। তবে গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বেশ বাড়লেও পরবর্তী সময়ে বিক্রির চেয়ে ভাঙানোর প্রবণতা অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছিল। ফলে এ খাতে সরকারের ঋণ ঋণাত্মক হয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন:
আকতার পারভেজ সর্বোচ্চ ভোটে সিএসই পরিচালক
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে বিক্রিতে নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকায় সংশোধিত বাজেটে সেটি কমিয়ে ১৪ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। তারপরও পুরো অর্থবছরে নিট বিক্রি (বিনিয়োগ) ঋণাত্মক হয় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এ সময়ে সঞ্চয়পত্রের কেনার চেয়ে ভাঙানোর প্রবণতা বেশি ছিল। পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, তার আগের দুই অর্থবছরেও সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক ধারায় ছিল। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৮ হাজার কোটি টাকা। তবে বিক্রি ধারাবাহিক কমতে থাকায় সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৭ হাজার ৩১০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছিল। পুরো অর্থবছরে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়েছিল প্রায় ২১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হওয়ার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্নের প্রমাণপত্র দাখিলের শর্ত শিথিল করেছে সরকার, আগে এই সীমা ছিল ৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া গত অর্থবছরের মাঝামাঝিতে এসে প্রতিষ্ঠান ব্যতীত ব্যক্তিপর্যায়ের সব সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে মেয়াদ শেষে পুনর্বিনিয়োগ সুবিধা চালু করা হয়। ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকে মেয়াদি হিসাবের পুনর্বিনিয়োগ সুবিধা আবার চালু করা হয়। ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ডের বিনিয়োগসীমা প্রত্যাহার করা হয়। পেনশনার সঞ্চয়ত্রে মুনাফা তিন মাসের পরিবর্তে প্রতি মাসে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া গত জানুয়ারি থেকে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে একটি সীমা পর্যন্ত সুদের হার বাড়িয়েছে সরকার। এসব সুবিধা বাড়ানোর পরও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে গতি আসেনি।
আরও পড়ুন:
বৃহত্তম হিমশৈল
এদিকে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ কমলেও ব্যাংক খাতে আমানত বাড়ছে। গত অর্থবছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। সেটি আগস্ট শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে (জুলাই-আগস্ট) ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে প্রায় ২৭ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। এতে আগস্ট শেষে বার্ষিক আমানতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ০২ শতাংশ, যা গত দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।