গাফিলতিতে শাস্তির হুশিয়ারি প্রধান উপদেষ্টার
প্রতিবছরই অধরা থাকছে শতভাগ বাজেট বাস্তবায়ন। বছর বছর বিশাল আকারের বাজেট দেওয়া হয়। অর্থবছরের শেষের দিকে তা সংশোধন করে কমানো হয়। সংশোধন করেও অর্থবছর শেষে শতভাগ বাজেট বাস্তবায়ন হয় না। তিন বছর ধরে ঘোষিত বাজেটের চেয়ে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা কম ব্যয় হচ্ছে। অর্থাৎ বাজেটের অর্থ ব্যয় করতে পারছে না সরকার। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ এবং প্রকল্পের অর্থছাড় সহজ করার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। চলতি অর্থবছরের শুরুতে বাজেট বাস্তবায়নে গতি আরও কম। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার গত এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন। এতে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বাজেট বাস্তবায়ন ও মনিটরিং বাড়াতে সংশ্লিষ্টদের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়নে গাফিলতি পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তির হুশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য থেকে জানা গেছে, পটপরিবর্তনের পরও দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে কোনো ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। উল্টো চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই মাসে অগ্রগতির হার গত প্রায় এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্নে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের জুলাই মাসে বাস্তবায়ন হার ছিল ৩ শতাংশ, আর গত জুলাই মাসে এই হার মাত্র ০.৬৯ শতাংশ। যেখানে গত ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এত আন্দোলন রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও বাস্তবায়ন হার ছিল ১.০৫ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে সমীক্ষা না করা, যোগ্যতম সরকারি কর্মচারীকে যথাযথ পদে নিয়োগ না দেওয়া, সরকারি কর্মচারীদের অদক্ষতা ও জবাবদিহির অভাব, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং বাস্তবতাবিবর্জিত উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের প্রাক্কলন- এসব বিষয়কে বাজেট বাস্তবায়ন না হওয়ার বড় কারণ। এদিকে বাজেট বাস্তবায়নের অদক্ষতার কারণে অতি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতও কম বরাদ্দ পাচ্ছে। ফলে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। যদিও অবকাঠামো নির্মাণে ঠিকই দেদার অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। আর ব্যয় হচ্ছে অনুন্নয়ন খাতের প্রায় সব বরাদ্দ।
আরও পড়ুন:
আকতার পারভেজ সর্বোচ্চ ভোটে সিএসই পরিচালক
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারি প্রকল্পের কাজে কাক্সিক্ষত গতি নেই। অর্থছাড় প্রক্রিয়া সহজ করা হলেও বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ করতে পারছে না মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। পতিত সরকারের রেখে যাওয়া অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। কিছু প্রকল্পের কাজ স্থগিত করা হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ এবং পুরনো প্রয়োজনীয় কোনো প্রকল্পই বাদ দেওয়া হয়নি। আবার প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তন আনা হয়েছে; তবুও সরকারের বাজেট বাস্তবায়নে তেমন ইতিবাচক কোনো প্রভাব পড়েনি গত এক বছরে। এতে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ জন্য অর্থ বিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশনকে বাজেট বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে মনিটরিং জোরদারের নির্দেশনা দিয়েছেন।
জানা গেছে, দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও জেঁকে বসা অনিয়ম-দুর্নীতির চক্র পুরোপুরি ভাঙতে পারছে না অন্তর্বর্তী সরকার। প্রশাসনের কোনো কোনো স্তরে এখনও দুর্নীতিবাজ ও অদক্ষ কর্মকর্তারা সক্রিয় রয়েছে বলে মনে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও অর্থ বিভাগ। এ জন্য স্বৈরাচার শেখ হাসিনার বিদায়ের পর বছর পেরিয়ে গেলেও বাজেট বাস্তবায়নের হার বাড়ানো সম্ভব হয়নি। বরং এডিপি বাস্তবায়নের হার উল্টো কমেছে। এ জন্য বাজেট বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে কড়া বার্তা দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। একই সঙ্গে এডিপি বাস্তবায়নের হার না বাড়ার কারণ অনুসন্ধান করছে অর্থ বিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশন।
আরও পড়ুন:
বৃহত্তম হিমশৈল
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোতে সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেখানে অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের মধ্যে এডিপি বাস্তবায়নের আনুপাতিক হার বাড়াতে না পারলে দায়ী কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানকে ভর্ৎসনা করা হবে। এতে কোনো কর্মকর্তার গাফিলতির প্রমাণ পেলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়ার কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যেসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এডিপি বাস্তবায়নে বেশি পিছিয়ে রয়েছে, সেসব বিভাগে মনিটরিং জোরদারের নির্দেশনা দিয়েছে অর্থ বিভাগ। এ ছাড়া আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেটা ঠিক থাকলে আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরেই বাজেট সংশোধন করা হবে। রীতি অনুযায়ী যা প্রতিবছরের মার্চ-এপ্রিলে করা হয়ে থাকে। নির্বাচনের কারণে এবার সেটা আগাম করা হবে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ বিভাগের সবশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে গত ৪৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাত্র ৬৮ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে। স্বাধীনতার পর গত ৪৮ বছরে এত কম এডিপি বাস্তবায়ন আর কখনই হয়নি। আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস হিসেবে জুলাইয়ে এডিপির ১ শতাংশেরও কম বাস্তবায়িত হয়েছে। এতে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও অর্থ বিভাগ। এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা উপদেষ্টা সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ১ শতাংশের কম এডিপি বাস্তবায়নের কারণ আমরা খতিয়ে দেখছি। আগামী নির্বাচনের আগেই বাজেট সংশোধন করা হবে।
আরও পড়ুন:
কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, প্রতিবছরই বাজেট বাস্তবায়ন অধরাই থেকে যাচ্ছে। সরকারের আগাম প্রচেষ্টাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি।