বিবেচনায় বিশ্ব পরিস্থিতি /

নতুন অর্থবছরেও কৃচ্ছ্রসাধন

আবু আলী
১৯ জুন ২০২৫, ০০:০০
শেয়ার :
নতুন অর্থবছরেও কৃচ্ছ্রসাধন

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে এক নম্বর অগ্রাধিকারে রেখে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট সাজিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তাই নতুন ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃচ্ছ্রসাধনের পথেই হেঁটেছেন তিনি। খরচ কমাতে বড় ধরনের কাঁচি চালিয়েছেন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি)। সেখানে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি বছরের তুলনায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা কম। এডিপিতে অযৌক্তিক ও অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কম গুরুত্বপূর্ণ ও রাজনৈতিক বিবেচনায় গৃহীত বেশ কিছু প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন বাজেট চূড়ান্ত হওয়ার আগে অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণে চলমান বৈশি^ক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। কারণ ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে দেশের অর্থনীতি নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে।

জানা গেছে, এ মুহূর্তে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ধীরগতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রস্তুতি এবং শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো। এই চ্যালেঞ্জগুলোকে সঙ্গে নিয়ে নতুন একটি অর্থবছর ২০২৫-২৬ শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। এর আগেই ইরান-ইসরাইলের মধ্যকার যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করছে অর্থবিভাগ। যা মোকাবিলার জন্য সম্ভাব্য মধ্যমেয়াদি কৌশল হিসেবে উৎপাদন বাড়ানো, আমদানি ব্যয় কমানো, রপ্তানি বৃদ্ধি ও সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রসাধনসহ আরও কয়েকটি কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া খরচ কমাতে অপ্রয়োজনীয় আমদানিতে আগামী বছরও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

এর আগে অর্থ উপদেষ্টা বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বর্তমান সরকার বিগত বাজেটের চেয়ে ছোট আকারের বাজেট প্রস্তাব করেছে। প্রবৃদ্ধি-কেন্দ্রিক ধারণা থেকে সরে এসে তারা চেষ্টা করেছেন সামগ্রিক উন্নয়নের ধারণায় জোর দিতে। তাই প্রথাগত ভৌত অবকাঠামো তৈরির খতিয়ান তুলে ধরার পরিবর্তে তারা এবারের বাজেটে প্রাধান্য দিয়েছেন মানুষকে। এ জন্য তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুশাসন, নাগরিক সুবিধা, কর্মসংস্থান ইত্যাদি বিষয়ের ওপর বিশেষ জোর দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় মনে করে, দেশের অর্থনীতি কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগ স্থবিরতা. ছিল উল্লেখযোগ্য। এর সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ। এই যুদ্ধের একটা বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক খাদ্য ও জ্বালানির বাজারে, যা থেকে নিরাপদ নয় বাংলাদেশও। কেন না, প্রয়োজনের কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ খাদ্য আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে। আর জ্বালানি খাত তো প্রায় পুরোটাই আমদানি নির্ভর। এসব সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার কয়েকটি মধ্যমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ করেছে। ওই সব কৌশলের কিছু কিছু প্রস্তাবিত বাজেটের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাকিগুলোও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ২ জুন উপস্থাপিত বাজেট ২০২৫-২৬ আসছে ২২ জুন উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অনুমোদন করা হবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাল্টাপাটি শুল্ক আরোপ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা সৃষ্টির আশঙ্কাও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন কী যুক্তরাষ্টের ৩৭ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের যে সময়সীমা পেছানো হয়েছে। তা খুব শিগগির শেষ হয়ে যাবে। এতে করে দেশের রপ্তানি খাত আরও বড় ধরনের ধাক্কার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে। উৎপাদন কমেছে রপ্তানিমুখী শিল্পেরও। ব্যয় বেড়েছে কৃষিসহ অন্যান্য উৎপাদন খাতের। বিনিয়োগের ওপর এমন নেতিবাচক প্রভাবের কারণে নতুন কর্মসংস্থানে চলছে ধীরগতি, যার প্রভাব পড়ছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপে দেখা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে দেশে বেকারত্ব বেড়েছে সোয়া ৩ লাখ। গত অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ ৩০ হাজার।