উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আহরণ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ চ্যালেঞ্জ
নানামুখী সংকট আর শর্তের ঘূর্ণাবর্তে দেশের অর্থনীতি। এক ধরনের অনিশ্চয়তায় ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও। মাঠে চলছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের আন্দোলন-সংগ্রাম। প্রশাসনেও স্থবিরতা কাটছে না। সরকারি চাকরিজীবীরা কাজ-কর্ম বন্ধ করে দাবি-দাওয়া আদায়ে প্রতিদিনই নানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছেন। এমন বৈরী পরিবেশের মধ্যে আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার সামান্য কমালেও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে রাজস্ব আহরণে। এ ছাড়া ঊর্ধ্বগতির মধ্যে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা এবং মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না।
জানা গেছে, নির্বাচিত সরকার না থাকায় আজ সোমবার বিকাল ৩টায় আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে তুলে ধরবেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তবে এটি সরাসরি সম্প্রচার নয়। বেলা ১১টায় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক হবে। সেখানে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেওয়া হবে। এর পরই অর্থ উপদেষ্টা বিটিভি কার্যালয়ে বাজেট প্রস্তাব রেকর্ড করতে যাবেন। সব মিলিয়ে ৪০-৪৫ মিনিটের বক্তব্য রেকর্ড করা হবে, যা বিকাল ৩টা থেকে বিটিভি প্রচার করবে। বাজেট বক্তব্যের বাকি অংশ পঠিত বলে গণ্য হবে।
জানা গেছে, এ বছর সংসদ কার্যকর না থাকায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর মতামত জানানোর সুযোগ থাকছে। অনলাইনে প্রাপ্ত মতামত ও সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন সেক্টরের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে, অধ্যাদেশ আকারে বাজেট পাস করার সময় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার বিষয়টি ভাববে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এবারও ২৯ জুন রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষে অর্থবিল ও পরের দিন প্রস্তাবিত বাজেট অধ্যাদেশ আকারে জারি করে আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর করা হবে।
জানা গেছে, অর্থ উপদেষ্টার বাজেট বক্তৃতার শুরুতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের প্রতি সমবেদনা জানানো হবে। তাদের জন্য সরকার কী করেছে এবং আগামী অর্থবছরে কী করা হবে, তারও একটি ফিরিস্তি থাকবে বাজেট বক্তৃতায়। বাজেট বক্তব্যে এবার থাকছে না কোনো ব্যক্তিবন্দনা। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতির কিছু পরিসংখ্যানও বাজেট বক্তৃতায় ওঠে আসবে। তবে এ দুর্নীতির বিস্তার নিয়ে বিশদ বক্তব্য থাকছে না এতে। কারণ, বিগত সরকারের দুর্নীতির বিষয় তুলে ধরতে আমলাদের এক ধরনের অনীহা রয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে প্রবৃদ্ধিকে ‘বলি’ দিয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকারকে অস্বাভাবিক ছোট করা হয়েছে। ফলে আগামী ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার চলতি অর্থবছরের চেয়েও কমিয়ে আনার প্রস্তাব করা হবে। চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার নির্ধারিত রয়েছে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আগামী অর্থবছরের জন্য এই বাজেটের আকার প্রস্তাব করা হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা কিনা চলতি অর্থবছরে বাজেটের চেয়ে ৭ হাজার কোটি টাকা কম।
জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘাটতির প্রস্তাব করা হবে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এটি মোট দেশজ সম্পদ বা জিডিপির ৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের বাজেট রয়েছে ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগের সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার কর্তৃক মূল্যস্ফীতি নির্ধারণ করা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছরও একই ছিল। আর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৫.৫ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছর ছিল সাড়ে ৬ শতাংশ। মূলত আগামী বাজেটে জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার সম্ভাবনা রয়েছে ৬৩ লাখ ১৫ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা।
এ দিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) আগামী অর্থবছরে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরে রয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ১৯ হাজার কোটি টাকা। আর কর বহির্ভূত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৪৬ হাজার কোটি টাকা। অনুন্নয়ন ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা।
আরও পড়ুন:
একে আবদুল মোমেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী
এদিকে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আহরণে মানুষের ওপর চাপ বাড়াবে এনবিআর। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও নিত্যব্যবহার্য পণ্যের ভ্যাট ও শুল্ক-কর বাড়ানো হয়ে থাকে। এতে বাজারে সেসব পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। আবার কিছু পণ্যের ভ্যাট ও শুল্ক-কর কমানো হয়। এতে সেসব পণ্যের দাম কমে। আসছে বাজেটে শুল্ক-কর বাড়ানো পণ্যের তালিকা দীর্ঘ হবে।
বেসরকারি আর্থিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, যদি আয়কর ও শুল্ক বাড়িয়ে ঘাটতি পুষিয়ে নিতে চায় সরকার, তবে তা জনগণের ওপর চরম চাপ তৈরি করবে। মূল্যস্ফীতির সময় এসব পদক্ষেপ হিতে বিপরীত হতে পারে।
দাম বাড়তে পারে যেসব পণ্য ও সেবার
ফ্রিজ-এসি : অব্যাহতির সংস্কৃতি পরিহার করতে রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনারের ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এতে দেশীয় ফ্রিজ-এসির দাম বাড়তে পারে। পাশাপাশি বিদেশি ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী আমদানি বাড়তে পারে।
মোবাইল ফোন : মোবাইল ফোন উৎপাদন ও সংযোজনে হ্রাসকৃত ভ্যাটহার বাড়ানো হচ্ছে। উৎপাদনের ক্যাটাগরিভেদে দুই থেকে আড়াই শতাংশ ভ্যাট বাড়ানো হচ্ছে। এতে দেশে তৈরি মোবাইল ফোনের দাম বাড়তে পারে।
ব্লেড : শেভিং কাজে ব্যবহৃত ব্লেডের দাম বাড়তে পারে। কারণ, স্টেইনলেস স্টিলের স্ট্রিপ থেকে প্রস্তুত ব্লেড এবং কার্বন স্টিলের স্ট্রিপ থেকে প্রস্তুতকৃত ব্লেডের উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করা হচ্ছে।
বাস-ট্রাক : বাস-ট্রাকের চেসিস বিদেশ থেকে আমদানির পর দেশে বডি প্রস্তুত করে রাস্তায় চলাচলের উপযোগী করা হয়। বাস-ট্রাকের বডি বানানোর ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। এতে বাস-ট্রাকের দাম বাড়বে।
টেবিলওয়্যার : বাসা-বাড়িতে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের তৈরি টেবিলওয়্যার, কিচেনওয়্যার, গৃহস্থালি সামগ্রী, হাইজেনিক ও টয়লেটসামগ্রী উৎপাদনে ভ্যাট সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হচ্ছে। এতে এসব পণ্যের দাম বাড়বে।
সুতা : দেশীয় টেক্সটাইল মিলে উৎপাদিত সুতার ভ্যাট বাড়ানো হচ্ছে। প্রতি কেজি কটন সুতা ও ম্যান মেইড ফাইবারে তৈরি সুতার সুনির্দিষ্ট কর ৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা করা হচ্ছে। এতে দেশীয় সুতায় তৈরি গামছা, লুঙ্গিসহ পোশাকের দাম বাড়তে পারে।
রড : রড, এঙ্গেল বার তৈরির প্রধান কাঁচামাল স্ক্র্যাপের সুনির্দিষ্ট করের পরিমাণ ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ টাকা করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিলেট-ইনগট সুনির্দিষ্ট কর এবং স্ক্র্যাপ গলানোর রাসায়নিকের ফেরো ম্যাঙ্গানিজ ও ফেরো সিলিকা ম্যাঙ্গানিজের শুল্ক-কর বাড়ানো হচ্ছে। তাই নির্মাণসামগ্রীর প্রধান উপকরণ রডের দাম বাড়তে পারে।
হেলিকপ্টার : নতুন অর্থবছরে হেলিকপ্টার আমদানিতে ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক বসানো হতে পারে।
কসমেটিক্স : নারীদের সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যবহৃত লিপস্টিক, লিপলাইনার, আইলাইনার, ফেসওয়াশ, মেকআপের সরঞ্জাম আমদানির ন্যূনতম মূল্য বিভিন্ন হারে বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি কেজি লিপস্টিক আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কায়নের ন্যূনতম মূল্য ২০ ডলার আছে। সেটি বাড়িয়ে ৪০ ডলার করা হতে পারে। একইভাবে অন্য সব কসমেটিকসের ন্যূনতম মূল্য বাড়ানো হচ্ছে। তাই বাজেটের পর এসব সৌন্দর্যবর্ধক সামগ্রীর দাম বাড়তে পারে।
বিদেশি চকলেট : চকলেটের দামও বাড়তে পারে। চকলেট আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কায়নের ন্যূনতম মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব থাকছে বাজেটে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের চকলেটের শুল্কায়নের ন্যূনতম মূল্য ৪ ডলার। এটি বাড়িয়ে ১০ ডলার করা হচ্ছে। এতে আমদানিকৃত সব ধরনের চকলেটের দাম বাড়তে পারে।
খেলনা : স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে বাজেটে বিদেশি খেলনার ট্যারিফ মূল্য বাড়ানো হচ্ছে। এতে বিদেশি খেলনার দাম বাড়বে।
আরও পড়ুন:
পাল্টে যেতে পারে আন্দোলনের ধরন
মার্বেল-গ্রানাইট : বাসা-বাড়ির মেঝেতে ব্যবহৃত মার্বেল-গ্রানাইট পাথর আমদানির সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৫ শতাংশ করা হচ্ছে। এতে মার্বেল-গ্রানাইটের দাম বাড়তে পারে।
মোটর : ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে এতে ব্যবহৃত ৭৫০ ওয়াটের ডিসি মোটরের আমদানি শুল্ক ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া দাম বাড়তে পারে মাখন, তারকাঁটা, সব ধরনের স্ক্রু, নাট-বল্টু, ইলেকট্রিক লাইন হার্ডওয়্যার, পোল ফিটিংস, সেলফ কপি পেপার, ডুপ্লেক্স বোর্ড/কোটেড পেপার, প্লাস্টিকের তৈরি ওয়ানটাইম গ্লাস, বাটি, প্লেট ইত্যাদি; তামাক বীজ, মোটরসাইকেল ও সাইকেলের যন্ত্রাংশ, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মায়েদের ফুড সাপ্লিমেন্ট, বেভারেজ আইটেম, দরজার তালা ইত্যাদি।