এক বছরেও মেলেনি পুলিশি প্রতিবেদন, হয়নি চার্জশিট
নিজের ফেসবুক আইডিতে সুইসাইড নোট লিখে আত্মহত্যা করেছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকা। আত্মঘাতী হওয়ার পেছনে এক সহপাঠী ও এক সহকারী প্রক্টরকে তিনি দায়ী করেন ফেসবুক পোস্টে। এরপর কুমিল্লায় নিজ বাড়িতে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এটি গত বছরের ১৫ মার্চের ঘটনা। হৃদয়স্পর্শী সেই মৃত্যুর এক বছর পূর্ণ হয়েছে গতকাল। এ ঘটনার পরের দিনই তদন্ত কমিটি গঠন করে সাত দিনের মধ্যে রিপোর্ট প্রদানের নির্দেশ দেয় প্রশাসন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই তদন্ত রিপোর্ট এ পর্যন্ত প্রকাশ করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ পর্যন্ত প্রকাশ হয়নি পুলিশের রিপোর্টও। এ ঘটনায় অবন্তিকার মা মামলা করলেও হয়নি চার্জশিট।
জানা যায়, গত বছর ১৬ মার্চ কর্তৃপক্ষ তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি জাকির হোসেনকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। এ কমিটি ১৩ জুন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় প্রশাসনের নিকট। তদন্ত রিপোর্ট সর্বশেষ সিন্ডিকেটে উঠলেও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। এমনকি প্রকাশও করা হয়নি এ রিপোর্ট।
অবন্তিকা হত্যা প্ররোচনা মামলায় তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্ত শিক্ষক ও ছাত্র গ্রেপ্তার হলেও গত ১ বছরে চার্জশিট হয়নি। পাওয়া যায়নি পুলিশি প্রতিবেদন, পাওয়া যায়নি ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টও।
আরও পড়ুন:
আকতার পারভেজ সর্বোচ্চ ভোটে সিএসই পরিচালক
সূত্র জানায়, হত্যাচেষ্টার এ মামলায় অভিযুক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে বিশেষ কোনো প্রমাণ এখনও মেলেনি। এ কারণেই চার্জশিট হয়নি। এদিকে মামলার তদন্ত কার্যক্রম না এগোলেও একের পর এক বদলি হচ্ছেন তদন্ত কর্মকর্তা। মামলাটির বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, তদন্ত রিপোর্ট কবে নাগাদ প্রকাশ করা হবে, এটা এখনও বলা যাচ্ছে না। সিনিয়র অফিসারদের জানিয়ে এরপর এ তদন্তের রিপোর্ট আদালতে জমা দিতে হবে। কবে নাগাদ এটি আদালতে তোলা হতে পারে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা বলা যাচ্ছে না। তবে শিগগিরই জমা দিয়ে দেব। জমা দিলে জানানো হবে। আমি হাল ছাড়ব না : অবন্তিকার মা
অবন্তিকার মা তাহমিনা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ তদন্ত রিপোর্ট কীভাবে প্রকাশ করবে? প্রকাশ করলে তো কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের হয়ে আসবে। এর পরও আমি হাল ছাড়ব না। এই রিপোর্টের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে কথা বলতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার গিয়াস উদ্দিন আমার সাথে অনেক বাজে ব্যবহার করেন। অন্যদিকে প্রশাসন শুধু বলে, আমরা শাস্তির যোগ্য ব্যবস্থা নিচ্ছি। কিন্তু তারা কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন, তা নিজেরাও জানেন না। এক বছর হয়ে গেছে, তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
অনিশ্চয়তায় ছাত্রের শিক্ষাজীবন, শিক্ষকের যোগদান
আরও পড়ুন:
বৃহত্তম হিমশৈল
জবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আলটিমেটামের ৬ ঘণ্টার মধ্যেই অবন্তিকার আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম ও সহপাঠী রায়হান সিদ্দিকী আম্মানকে পুলিশ আটক করে। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে আম্মান ও শিক্ষক দ্বীন ইসলামকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। গ্রেপ্তারের পর দ্বীন ইসলাম প্রায় ৪ মাস এবং আম্মান প্রায় ৮ মাস জেলে ছিলেন। এখন তারা দুজনই জামিনে আছেন। তবে ক্লাসে ফিরতে পারেননি কেউ। আম্মানের বন্ধুদের মাস্টার্স শেষ হতে চললেও বাকি শিক্ষাজীবন নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছেন তিনি। তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ না হওয়ায় এবং পুলিশি রিপোর্ট না আসায় চাকরিতে যোগদান করার নির্দেশ পাচ্ছেন না শিক্ষক দ্বীন ইসলাম। তার বেতন-ভাতাও বন্ধ।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থী আম্মান বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকার কারণে সরকারি চাকরিতে আবেদন করতে গেলে অনেক ঝামেলার সম্মুখীন হতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বহিষ্কার করার ফলে আমি মাস্টার্সও শেষ করতে পারছি না। এতে করে আমার ক্যারিয়ারের ওপর অনেক বড় একটা প্রভাব পড়ছে। আমি চাই জবি প্রশাসন সিদ্ধান্তটাকে এভাবে ঝুলিয়ে না রেখে যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করুক। তদন্ত করে তারা কী কী প্রমাণ পেয়েছে, তা সবার সামনে তুলে ধরুক। তদন্ত কমিটির দেওয়া রিপোর্টে যদি এই ব্যাপারে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তারা আমার বিরুদ্ধে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুক আর যদি তদন্ত কমিটির রিপোর্টে আমি নির্দোষ প্রমাণিত হই তাহলে আমার বিরুদ্ধে যেসব নিষেধাজ্ঞা আছে, সেগুলো তুলে আমাকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিক।
অভিযুক্ত শিক্ষক দ্বীন ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমার সাথে রাজনৈতিক আচরণ করছে। আমার সাথে অন্যায় আচরণ করছে। এই রিপোর্ট গত ২ জানুয়ারি ৯৯তম সিন্ডিকেট সভায় উঠেছে। এই আত্মহত্যায় আমি জড়িত কিনা বা এই রিপোর্টে আমার সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা, এই ব্যাপারে তারা সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের চিঠিতে কিছু লেখেননি। চিঠিতে তারা লিখেছেন, আদালতের মামলা শেষ করে এলে তারা আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের সুযোগ দেবেন। আমার প্রশ্ন- আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করব কিনা এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আদালতের মামলার দিকে যদি তাকিয়ে থাকতে হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটি কেন গঠন করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাকে ইচ্ছাকৃতভাবে হয়রানি করছে। তৎকালীন প্রক্টর মোস্তফা কামাল সেই সময়ে অবন্তিকার অভিযোগ আমলে নেননি। এই আদ্মহত্যার দায় তার।
আরও পড়ুন:
কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম
জবি উপাচার্যের ভাষ্য
জবি উপাচার্য রেজাউল করিম বলেন, অবন্তিকার আত্মহত্যার সাথে আমাদের যেসব শিক্ষক এবং যেসব ছাত্র-ছাত্রী জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে ব্যাপারে সুপারিশ করা হয়েছে এবং আমরা সেই আঙ্গিকে ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। তদন্ত রিপোর্ট কবে নাগাদ প্রকাশ হতে পারে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এই রিপোর্টের কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে। বাস্তবায়ন হয়ে গেলে আমরা জানাব। এখানে অনেক আইন-কানুনগত ইস্যু আছে। এসব আইনকানুন দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এখন এই রিপোর্ট প্রকাশ করার ফলে কেউ যদি কোর্টে গিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে, তাহলে অনেক বড় ঝামেলায় পড়ে যাব। এরই মধ্যে আমরা দুটি ঝামেলায় পড়ে আছি।