ওয়াসার তাকসিমকে ছাড় দেবে না দুদক
দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন প্রকৌশলী তাকসিম এ খান। ২০০৯ সালে এই পদে প্রথমবারের মতো নিয়োগ পেয়েছিলেন তিনি। এরপর দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ে। সবশেষ গত বছরের আগস্টে সপ্তমবারের মতো আরও তিন বছরের জন্য ওই পদে নিয়োগ পান তিনি। তার বিরুদ্ধে ওয়াসার প্রকল্পে দুর্নীতি, ঠিকাদার নিয়োগে সিন্ডিকেট, ঘুষ লেনদেন, পছন্দের লোককে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, কেনাকাটাসহ নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ নিয়ে প্রতিবারই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)
অনুসন্ধান করে সত্যতা পায়। এ কারণে মামলারও সুপারিশ করা হয়। কিন্তু প্রতিবারই প্রভাব খাটিয়ে দুদকের অনুসন্ধান ধামাচাপা দিয়ে রাখেন তিনি।
ছাত্র আন্দোলনে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মন্ত্রী-এমপিসহ দলটির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি ঘনিষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তারাও বেকায়দায় পড়েন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত ১৪ আগস্ট ওয়াসার এমডি পদ থেকে পদত্যাগ করেন তাকসিম এ খান। এবার আবার তার অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে সরব হয়েছে দুদক। তাকসিম এ খানের অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে অনুসন্ধানে তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি। এ বিষয়ে দুদকের উপ-পরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা সৈয়দ নজরুল ইসলামের স্বাক্ষরে গতকাল সোমবার বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) বরাবর একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। অভিযোগ অনুসন্ধানের কথা উল্লেখ করে এতে বলা হয়- ‘বিশ^স্ত সূত্রে জানা যায় যে, তিনি (তাকসিম) সপরিবারে দেশত্যাগ করে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। অনুসন্ধান কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য তার বিদেশ গমন রহিত করা একান্ত আবশ্যক।’
অন্যদিকে, ১৫ বছর ঢাকা ওয়াসার দায়িত্বে থাকাকালীন তাকসিম এ খান ও তার ঘনিষ্ঠদের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ সংশ্লিষ্ট চার ধরনের নথি চেয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবর নোটিশ পাঠিয়েছেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা। এতে ঢাকা ওয়াসায় তাকসিমের প্রথম নিয়োগ প্রদানের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন, নিয়োগপত্রসহ সংশ্লিষ্ট সব রেকর্ডপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি চাওয়া হয়। একই সঙ্গে তার চাকরির সময়কাল, মেয়াদ বৃদ্ধি সংক্রান্ত তথ্য, মেয়াদ বৃদ্ধির নীতিমালা/বিধি সংক্রান্ত তথ্য; তাকসিম এ খান ও তার কোনো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম/অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভ্যন্তরীণ/মন্ত্রণালয়ের কোনো তদন্ত করা হয়ে থাকলে, সেই প্রতিবেদনের আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কিনা, সে সংক্রান্ত নথিপত্র চাওয়া হয়। এ ছাড়া তার সময়কালীন ডিএমডি পদে নিয়োগ সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র এবং পদোন্নতির সব রেকর্ডপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি চাওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন:
একে আবদুল মোমেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী
মামলার সুপারিশ : গত বছরের মে মাসে ঢাকা ওয়াসার অর্গানোগ্রামের বাইরে চুক্তিভিত্তিক নিজের পছন্দের লোকদের নিয়োগের অভিযোগে তাকসিম এ খানসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে কমিশনে একটি মামলা দায়েরের সুপারিশ করেছিলেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা। দুদকের কর্মকর্তারা জানান, ওই সময় তাকসিমের প্রভাবের কারণে শেষ পর্যন্ত মামলাটি অনুমোদন করেনি দুদক। সম্প্রতি নতুন করে মামলাটি দায়েরের জন্য কমিশনে সুপারিশ করছেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা। তিনি জানান, তাকসিমের বিরুদ্ধে সবগুলো অভিযোগের অনুসন্ধান করা হবে। কমিশন তাকে আর ছাড় দেবে না।
সুপারিশে বলা হয়, ঢাকা ওয়াসার অর্গানোগ্রামে পরিচালক (উন্নয়ন) ও পরিচালক (কারিগর) কোনো পদ না থাকা সত্ত্বেও এসব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে তাদের ২০১৮ সালের ৪ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের আগস্ট পর্যন্ত বেতন-ভাতা বাবদ ১ কোটি ৯৮ লাখ ৬৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। অবৈধভাবে জনবল নিয়োগ দিয়ে এ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তাকসিমের সঙ্গে আরও ৯ জনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে দুদক।
দুদক থেকে জানা যায়, ২০০৯ সালে ঢাকা ওয়াসার এমডি হিসেবে নিয়োগ পান প্রকৌশলী তাকসিম এ খান। এরপর সাত ধাপে সময় বাড়িয়ে গত ১৩ আগস্ট পর্যন্ত এ পদে ছিলেন তিনি। বিতর্কিত তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধে পুনঃনিয়োগের ক্ষেত্রেও বিধি অমান্য করার অভিযোগ রয়েছে। এদিকে, ওয়াসার এমডি পদে থাকা অবস্থায় তাকসিম এ খানসহ অন্যদের বিরুদ্ধে সংস্থাটির পদ্মা জশলদিয়া প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা, গন্ধ্রবপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পে ১ হাজার কোটি টাকা, দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পে ১ হাজার কোটি টাকা, গুলশান বারিধারা লেক দূষণ প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকার অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে।
এ ছাড়া প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো, ঠিকাদার নিয়োগে সিন্ডিকেট, ঘুষ লেনদেন, পছন্দের লোককে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, অপছন্দের লোককে ওএসডি করাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলাম এসব অনুসন্ধান করছেন।
পুরনো অভিযোগ-অনুসন্ধান নিয়ে দুদক সবর হচ্ছে স্বীকার করে গতকাল সংস্থাটির সচিব খোরশেদা ইয়াসমীন সাংবাদিকদের বলেন, দুদক সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে। সব অভিযোগের যথানিয়মে অনুসন্ধান-তদন্ত করা হবে। গত এক বছর থেকে কমিশনের কাজে অনেক গতি এসেছে। গুরুত্ব সহকারে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন:
পাল্টে যেতে পারে আন্দোলনের ধরন