ইসিকে শক্ত অবস্থান নেওয়ার আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক
২০ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:১০
শেয়ার :
ইসিকে শক্ত অবস্থান নেওয়ার আহ্বান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে সরকারের কাছে নতজানু না হয়ে নির্বাচন কমিশনকে ‘শক্ত’ অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। এ ছাড়া নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে মাঠপ্রশাসনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে এসব পরামর্শ ওঠে এসেছে। সংলাপে নির্বাচনী আচরণবিধির নানা অসঙ্গতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর তোপের মুখে পড়েছে ইসি। সাংঘর্ষিক বিধান, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিঘ্ন হওয়ার আশঙ্কা, আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিতে সক্ষমতা, সদিচ্ছা অভাবসহ বিভিন্ন প্রশ্নবানে সংস্থাটিকে জর্জরিত করে দলগুলো। সংলাপে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসতে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি ও আচরণবিধি পরিপালনে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশন (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন।

নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে চলমান সংলাপের এটি ছিল শেষ পর্ব, যেখানে ৪৭টি দল অংশ নেয়। দলগুলো তাদের মতামত ও প্রস্তাব দিয়েছে। এদিন সংলাপে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গণভোটের প্রস্তুতি জানতে চাইলে সিইসি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন। সিইসি বলেন, কীভাবে গণভোট করব না করব, তা নিয়ে আগে আইন করতে হবে। এএমএম নাসির উদ্দিন বলেন, জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গণভোট করেছিলেন মার্শাল প্রিপারেশনের আন্ডারে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ একটা আইন করেছিলেন। গণভোট কীভাবে হবে, এ বিষয়ে রাজনৈতিক নেতারা আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন। অনেকে এ নিয়ে অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। আইনটা হওয়ার পর এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব।

একই দিন সংলাপে চলমান মতবিনিময় প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানালেও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আচরণবিধি মেনে নির্বাচন করার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান। তিনি বলেছেন, ইসি শক্ত অবস্থানে থাকুন। সংবিধানই আপনাদের ক্ষমতা দিয়েছে। নতজানু হওয়ার কোনো কারণ নেই।

গতকাল বুধবার ইসির সংলাপে বিএনপির পক্ষ থেকে অংশ নিয়ে ড. মঈন খান বলেন, এই মতবিনিময় নতুন কিছু না। আগের আলোচনাগুলোতে একাধারে আমরা সফল হয়েছি বা ব্যর্থ হয়েছি বলব না। তবে সংলাপের প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানাই।

প্রার্থীদের করণীয় প্রসঙ্গে ড. মঈন খান বলেন, রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের একটাই করণীয়। নিয়মনীতি মেনে নির্বাচন করা। আচরণবিধির প্রতিপালন করতেই হবে। এ নিয়ে দ্বিমত নেই। তবে তফসিলের বিষয়ে তিনি কঠোর অবস্থান দেখছেন না। বলেন, তফসিলের বাইরে যাওয়ার সুযোগ দেখছি না। আমরা পরামর্শ দিয়েছিলাম। সব কিছুর প্রতিফলন দেখিনি।

অন্যদিকে, নিয়মনীতি প্রণয়ন প্রসঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন মঈন খান। তিনি বলেন, যতই অঙ্গীকারনামা নেওয়া হোক, নিজেদের সংশোধন না করলে কোনো কাজে আসবে না। এ ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান স্পষ্ট না। যত নিয়মনীতি তৈরি করা হবে, তত লঙ্ঘনের প্রবণতা বাড়বে।

বর্তমান যুগে বাকস্বাধীনতার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) এবং অপতথ্যের উত্থান নিয়েও তিনি কথা বলেন। বিএনপির এই নেতা বলেন, বর্তমান যুগে বাকস্বাধীনতার নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। তবে কথা বলার স্বাধীনতা যেহেতু দেওয়া হয়েছে, সেহেতু এর অপব্যবহার হবেই।

ড. মঈন খান মনে করেন, দেশ বর্তমানে একটি ক্রান্তিকাল পার করছে এবং এ সময়ে ইসির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ইসিকে তাদের বিদ্যমান লোকবলের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ইসির নিজস্ব লোকবল থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগের দাবি জানান তিনি। তিনি বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তা হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে।

এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লটারির মাধ্যমে জেলা প্রশাসক (ডিসি)- পুলিশ সুপার (এসপি) বদলির দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সংলাপে অংশ নিয়ে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আপনারা লক্ষ্য করেছেন যে এক মাসও হয়নি, ২০ দিনও হয়নি, একজন ডিসি চলে গেলেন। সেটাও হঠাৎ করে। আবার এক সপ্তাহের মধ্যে অনেককে রদবদল করা হয়েছে। এটার পেছনে মনে হয় যেন কোনো একটা ডিজাইন, একটা উদ্দেশ্যে আছে। তফসিল ঘোষণার পর প্রশাসনের সব ক্ষমতা ইসির হাতে আসে। প্রশাসনের রদবদল ইত্যাদি করে ইসি। সবচেয়ে নিরপেক্ষ এবং আস্থা রাখার মতো একটা উপায় হলো যে লটারির মাধ্যমে ট্রান্সফার করে দেওয়া, যার যেখানে তকদির আছে, সে চলে যাবে। এটাতে কোনো কোশ্চেন থাকে না।

গোলাম পরওয়ার বলেন, এখনকার আচরণবিধিতে লাউডস্পিকার ব্যবহারে বলা হয়েছে যে, একই সময়ে নির্বাচনী এলাকায় তিনটি লাউডস্পিকার ব্যবহৃত হতে পারবে। বিরাট নির্বাচনী এলাকা। একজন প্রার্থী বা তাঁর পক্ষের ভোটাররা বিভিন্ন জায়গায় সমাবেশ করবে। স্কুল-কলেজের পরীক্ষা সাধারণত ডিসেম্বর-নভেম্বরে হয়ে যাচ্ছে। যদি ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন হয়, তাহলে তিনটি লাউডস্পিকারের মধ্যে সীমিত করে দিলে প্রচারণায় সংকট তৈরি করতে পারে। এটা আমরা পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করছি।

ভোটার লিস্টের ছবিগুলো স্পষ্ট নয় উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রিন্টিং এত স্পষ্ট নয়। চেহারাও চেনা যায় না। এটা আমরা জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে যখন আপনাদের সঙ্গে ফরমালি দেখা করেছিলাম, ১৮টি দফায় আমরা যে পরামর্শ দিয়েছি, তার মধ্যে একটি ছিল- ভোটার লিস্টের ছাপা ছবিগুলো স্পষ্ট হতে হবে। চিনতে না পারলে সেখানে ঝামেলা হয়। এ বিষয়ে আপনাদের কথা বলা দরকার।

সংলাপে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, আসন্ন নির্বাচনে এনসিপি পুরোপুরি সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো, বিশেষ করে গণভোটের রূপরেখা, নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) দ্রুত প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি ইসির স্বাতন্ত্র্য, নারী ভোটারদের নিরাপত্তা এবং প্রবাসী ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

এ সময় নারী ভোটারদের জন্য বিশেষ মনিটরিং সেল গঠনের প্রস্তাব দেন পাটওয়ারী। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনের সময় নারীরা সাইবার হ্যারাসমেন্টের শিকার হতে পারেন, তাই বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন।

প্রবাসী ভোটারদের অংশগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এনসিপির এ নেতা বলেন, তাঁদের জন্য সময় সীমিত। যদি প্রক্রিয়া আগে থেকে চালু করা হয়, তাহলে অংশগ্রহণ বাড়বে। এটি ভোটার সংখ্যা ও নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করবে।