ইসির শক্তিশালী ভূমিকা চায় দলগুলো
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি নিরপেক্ষ আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। গতকাল রবিবার নির্বাচন ভবনে ইসির সংলাপে অংশ নিয়ে বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দ এমন আহ্বান জানান। সংলাপে কয়েকটি দল গণভোটের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, অতীতে নির্বাচনী সংস্কৃতিতে নানা দুর্বলতা ও অপকর্মের কারণে মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে। আইনি সংস্কার ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ সংস্কৃতির পুনর্গঠনে কাজ করছে ইসি। তিনি বলেন, আশা করি দলগুলোর প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাব। নির্বাচনে অপতথ্য, ভুল তথ্য ঠেকানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এসব বিষয় আগের কমিশনকে ট্যাকল করতে হয়নি। এটা বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় দিনের সংলাপে গতকাল রবিবার ১২টি দলকে আমন্ত্রণ জানায় ইসি। তৃণমূল বিএনপি ছাড়া বাকি ১১টি দল এতে অংশ নেয়। এসব দলের কয়েকটি আওয়ামী লীগের আমলে অনুষ্ঠিত বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।
গতকাল সংলাপের শুরুতে ইসলামী ঐক্যজোটের দুই পক্ষের প্রতিনিধি আসায় কিছুটা হট্টগোল হয়। দলটির যুগ্ম মহাসচিব দাবি করা মইনুদ্দিন রুহিসহ তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল সংলাপে আগেই চলে আসে। এরপর আরেক পক্ষের তরফে মাওলানা জোবায়েরসহ একটি প্রতিনিধি দল সংলাপকক্ষে প্রবেশ করে। তাদের কাছে ইসির পাঠানো আমন্ত্রণপত্র ছিল। এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে শুরু হয় হট্টগোল। এ সময় ইসি সচিব অনুরোধ জানান, যাদের কাছে চিঠি নেই, তারা যেন সম্মেলন কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। এরপর পরিস্থিতি শান্ত হয়।
সংলাপে অংশ নিয়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, মানুষ গত তিনবারের নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। মানুষ না খেয়ে থাকতে রাজি, কিন্তু ভোট দিতে না পারার যন্ত্রণা সহ্য করতে রাজি নয়। আপনারা (ইসি) যদি সামান্যতমও তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত
আরও পড়ুন:
রাজধানীতে কিশোরীসহ ২ জনের মরদেহ উদ্ধার
করতে পারেন, জনগণের পক্ষ থেকে আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব। তিনি আরও বলেন, গত ১৫ মাস সরকার ডাকলেও যাইনি। নির্বাচন হওয়ার আগ পর্যন্ত সরকারের ডাকে আলোচনায় যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। বর্তমান সরকার দেশকে একেবারেই বিভক্ত করে ফেলেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তাদের সম্মানে এসেছি।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কাদের সিদ্দিকী বলেন, গতবার আমি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলাম। আমার একজন সহকর্মীর ছেলে, যাকে খুব আদর করতাম, সে যেদিন আমার এলাকায় এমপি পদে দাঁড়িয়ে জিতল, আমি খুশি হয়েছি। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এই পরিবর্তন বিএনপি, জামায়াত বা নতুন কোনো শক্তি করেনি। আল্লাহ অসন্তুষ্ট হলে আল্লাহই শাসকের গদি সরিয়ে দেন। গণভোটের বিষয়ে তিনি বলেন, এবার গণভোট ও জাতীয় ভোট একসঙ্গে করাটা বড় অসঙ্গতি। গণভোটে চারটি প্রশ্ন। মানুষ কি দুটি প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’, দুটি প্রশ্নে ‘না’ দিতে পারবে? জনগণ জানে না। গণভোটে ৭০-৮০ শতাংশ ভোট না পড়লে নির্বাচন সন্দেহের মুখে পড়বে, যোগ করেন তিনি।
ইসির উদ্দেশে কাদের সিদ্দিকী বলেন, আপনারা যদি জনগণকে ভোট দেওয়ার সুযোগ দিতে পারেন, তাহলেই দেশে শান্তি ফিরবে। শান্তি ফিরলে সুইজারল্যান্ডের চেয়েও শান্ত দেশ হতে পারে বাংলাদেশ।
গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ইসির ও পুরো জাতির আস্থা থাকে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, অতীতে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা পাইনি; তাদের সঙ্গে অদৃশ্য শক্তি ছিল।
আরও পড়ুন:
নির্বাচন নিয়ে কী ভাবছে এলডিপি?
ইসির উদ্দেশে সুব্রত চৌধুরী বলেন, আপনাদের মেয়াদে সংসদ নির্বাচন বা স্থানীয় নির্বাচন হোক, সেগুলোর নিরপেক্ষতা ধরে রাখতে হবে এবং সেটা যেন জনগণের কাছে দৃশ্যমান হয়। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত গণভোট যেন হাস্যকর না হয়। এ বিষয়ে আপনাদের শক্ত থাকতে হবে।
গণফ্রন্টের মহাসচিব আহমদ আলী শেখ বলেন, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য ইসির যেসব সক্ষমতা দরকার, তা সুনিশ্চিত করতে হবে।
ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী ৯টি প্রস্তাবনা তুলে ধরে বলেন, গত ১৫ বছরে যে তিনটি নির্বাচন হয়, সবগুলোই বিতর্কিত। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার পাশাপাশি সারাদেশে একই দিনে নির্বাচন না করে চার ধাপে নির্বাচন আয়োজন করার দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি বলেন, এ সংলাপ আগে হলে ভালো হতো। তাহলে আরপিও সংশোধনী ও আচরণবিধির সংশোধনী নিয়ে এত আলোচনা হতো না। কমিশন সব অংশীজনদের কাছ থেকে মতামত নেয়নি। আমাদের কাছে থেকে ইসি আগে কোনো মতামত নেয়নি। এখন আমরা সুপারিশ দিলেও তা কাজে আসবে না।
বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ নাজমুল হক প্রধান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ আগে হলে ভালো হতো। তিনি আরও বলেন, আচরণবিধিতে জামানত বাড়ানো হয়েছে, এটা কমানো উচিত।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র প্রেসিডিয়াম মেম্বার সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী বলেন, গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে হলে গণভোটের গুরুত্ব থাকবে না। গণ্ডগোল হলে ভোটকেন্দ্র বন্ধ থাকবে। তখন গণভোটের কী হবে? আমরা চাই, গণভোট আলাদা দিনে হোক। তিনি যোগ করেন, ভোটের আগে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করুন। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সেনাবাহিনী মোতায়েনেরও আহ্বান জানান তিনি।