নতুনরূপে আবির্ভূত হচ্ছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মানবাধিকার লঙ্ঘনও তদন্ত করতে পারবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
৩১ অক্টোবর ২০২৫, ০৫:০৭
শেয়ার :
নতুনরূপে আবির্ভূত হচ্ছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, রাষ্ট্রীয় অন্য যেকোনো সংস্থা তথা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে। এর ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত থাকলে কমিশন তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবে। এক্ষেত্রে ‘ওপরের নির্দেশ’ বলে অপরাধ থেকে আর দায়মুক্তি পাবেন না সরকারি কর্মকর্তা তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কোনো সদস্য। এমনকি কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই কারাগার, কিশোর সংশোধনাগার, গোপন আয়নাঘর (আটককেন্দ্র) বা যে কোনো আটককেন্দ্র পরিদর্শন করতে পারবেন মানবাধিকার কমিশনের সদস্য ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া অধ্যাদেশে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।

চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া খসড়া অধ্যাদেশটি বিদ্যমান ২০০৯ সালের আইন

প্রতিস্থাপন করবে। কমিশন একটি সংবিধিবদ্ধ স্বাধীন সংস্থা হবে। সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অধীন হবে না। লিখিত অভিযোগ ছাড়াও গণমাধ্যমে প্রচারিত বা প্রকাশিত প্রতিবেদন বা যেকোনো মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কিত তথ্যের ভিত্তিতে কমিশন ঘটনা তদন্ত করতে পারবে।

উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক নিয়ে ব্রিফ করেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের একটা মানবাধিকার কমিশন ছিল। এটা খুব দন্তহীন একটা প্রতিষ্ঠান ছিল এবং সেখানে গুরুতর কিছু সমস্যা ছিল। কমিশনের নিয়োগ পদ্ধতির ত্রুটি ও এখতিয়ারে মারাত্মক ঘাটতি ছিল উল্লেখ করে তিনি জানান, অধ্যাদেশের কয়েকটা উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছেÑ মানবাধিকারের সংজ্ঞা সম্প্রসারিত করে বাংলাদেশ কর্তৃক অনুসমর্থিত প্রচলিত আইন দ্বারা বলবৎযোগ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিলে ঘোষিত বা প্রথাগত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন দ্বারা স্বীকৃত মানবাধিকারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আইন উপদেষ্টা জানান, মানবাধিকার কমিশন গঠিত হবে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন সার্বক্ষণিক সদস্য দ্বারা। প্রথমে বলা হয়েছে সাতজনের, কিন্তু আজকে সিদ্ধান্ত হয়েছে পাঁচজনের হবে। পাঁচজনই সার্বক্ষণিক থাকবেন। আর চেয়ারপারসন ও কমিশনারদের শূন্য পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ প্রদান করার জন্য আপিল বিভাগের একজন বিচারকের নেতৃত্বে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটা বাছাই কমিটি করার বিধান করা হয়েছে।

আইন উপদেষ্টা বলেন, নিয়োগ পদ্ধতি একটু বদলানো হয়েছে। একটা গণবিজ্ঞপ্তি যাবে, একই সঙ্গে কমিশনের জন্য কিছু নাম সংগ্রহ করা হবে। উচ্চ আদালতের বিচারকদের নিয়োগের মতোই আইনটি করা হয়েছে। বাছাই কমিটি সাক্ষৎকার নিয়ে নিয়োগ প্রদান করবে। আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সীমাবদ্ধতা ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ আরও কিছু কিছু ক্ষেত্রে কমিশনের তদন্তের এখতিয়ারের ঘাটতি ছিল। তিনি বলেন, গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা আইনসহ মানবাধিকার সংরক্ষণমূলক যে কোনো আইনের মূল দায়িত্ব মানবাধিকার কমিশনকে প্রদানের সুযোগ রাখা হয়েছে।

উপদেষ্টা জানান, গুমসংক্রান্ত আইন আজকে চূড়ান্ত করা যায়নি। সামনের সপ্তাহে আশা করি হয়ে যাবে। আমরা আসলে আলাদা করে গুম কমিশন করব না, মানবাধিকার কমিশন ওই দায়িত্ব পালন করবে, সেই বিধান আইনে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, অন্য কোনো আইনে যেমনÑ হেফাজতে মৃত্যুসংক্রান্ত আইন থাকলে, কমিশন তা তদন্ত করতে পারবে। কমিশনের আদেশ বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং সুযোগটি অবারিত রাখা হয়েছে।

এদিকে কমিশনের অনুসন্ধানকালে অন্তর্বর্তী আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা প্রসঙ্গে চূড়ান্ত করা খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তকালে কমিশন ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে যেকোনো আইনানুগ অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে বা নির্দেশ দিতে পারবে।

খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, তদন্ত কর্মকর্তা কোনো রাষ্ট্রীয় বা সরকারি প্রতিষ্ঠান বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর যেকোনো পর্যায়ের কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন বা তথ্য-প্রমাণ তলব করতে পারবেন। কমিশন তদন্তের স্বার্থে সাধারণ মানুষ বা যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বা সম্পৃক্ততার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এ ছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আদালতে মামলা বা আইনগত কার্যধারা দায়ের করা কিংবা বিচারাধীন কোনো মামলায় বা আইনগত কার্যধারায় পক্ষ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে। কমিশনে অভিযোগ দায়েরের জন্য সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির পক্ষে অন্য কোনো বক্তিকে আইনি সহায়তা প্রদান করতে পারবে।