এক মহাজীবনের আক্ষেপ
বদরুদ্দীন উমর
বরেণ্য লেখক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর মারা গেছেন। ৯৪ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে রোববার ৭ সেপ্টেম্বর সকালে চলে যান। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন। আর রেখে গেছেন বর্নাঢ্য জীবনের কীর্তি - আপোষহীন নিজস্ব দর্শন, গভীর পাণ্ডিত্য, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সততা-সাহস ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার অনন্য নিদর্শন।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বদরুদ্দীন উমর একজনই; যিনি সত্য উচ্চারণে ছিলেন বেপরোয়া– কোনো কিছুই তোয়াক্কা করতেন না। ফলে দীর্ঘজীবনে কখনোই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কোনো শাসকের সুনজরে ছিলেন না।
বদরুদ্দীন উমর ছিলেন আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক মানুষ। অন্ধকার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তার কলম ছিল বরাবরই সোচ্চার। মোল্লাতন্ত্রে বিরুদ্ধে লিখেছিলেন, ‘থুতনীর নীচে চুল রাখিয়া ডিম কে আন্ডা বললেই মুসলমান হ ওয়া যায় না’। মার্কসবাদী এই তাত্ত্বিক-বিশ্লেষক সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। তবে এমন দলের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন যারা আদর্শ বোঝেন, কিন্তু জনগণের ভাষা বুঝতে অক্ষম। তাই বামপন্থি এই রাজনৈতিক নেতা চিরকাল ট্র্যাজিক অন্তরালেই থেকে গেলেন। এতে অবশ্য কিছু যায় আসে না। নিজের মেধা ও মনন দিয়েই তিনি সম্মানের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে যান।
জন্ম, শৈশব ও পড়াশোনা
১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বর্ধমান শহরে জন্মগ্রহণ করেন বদরুদ্দীন উমর। বাবা আবুল হাশিম ছিলেন মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ। মা মাহমুদা আখতার মেহেরবানু বেগম ছিলেন গৃহিনী। আবুল হাশিম অভিন্ন ও অসাম্প্রদায়িক ভারত প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন, তিনি পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধী ছিলেন। তবে দেশ বিভাগ হয়ে গেলে সপরিবারে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং ১৯৫০ সাল থেকে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
বদরুদ্দীন উমর ১৯৪৮ সালে বর্ধমান টাউন স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৫০ সালে তিনি বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৩ সালে স্নাতক সম্মান সম্পন্ন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে ১৯৫৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিলোসফি, পলিটিক্স অ্যান্ড ইকোনমিক্স (পিপিই) ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবন
আরও পড়ুন:
রাজধানীতে কিশোরীসহ ২ জনের মরদেহ উদ্ধার
১৯৬২ সালে দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবনের শুরু করেন। ১৯৬৩ সালে যোগ দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার তৎপরতাতেই বিশ্ববিদ্যালয়টির সমাজ বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচনাকারী ছিলেন পাকিস্তানিদের চোখের বিষ। তিনি পাকিস্তান সরকারের ও সরকার সমর্থকদের চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন। তৎকালীন গভর্নর মোনায়েম খানের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের প্রতিবাদে ১৯৬৮ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করেন। শিক্ষকতা ছেড়ে কমিউনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক গণকণ্ঠ। 'সংস্কৃতি' নামে একটি রাজনৈতিক সাময়িকী সম্পাদনা করেছেন। পরবর্তীতে তিনি সার্বক্ষণিক লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করেন। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন পথিকৃত ইতিহাসবিদ ও তাত্বিক হিসেবে।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচনার পথিকৃত
বদরুদ্দীন উমরের সর্বজনস্বীকৃত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৃতি হচ্ছে তিনটি বিশাল খণ্ডে রচিত ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ শীর্ষক গ্রন্থটি।এই গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে একটি সুসংহত রূপ দিয়েছেন। ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত সবচেয়ে তথ্যবহুল ও সমাদৃত বইগুলির মধ্যে এটি অন্যতম। এতে তিনি ভাষা আন্দোলনের পটভূমি ও তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। এই গ্রন্থ রচনার পটভূমি ছিল ব্যাপক ও গবেষণামূলক। এই কাজটি সম্পন্ন করতে তাঁকে প্রায় বিশ বছর (১৯৬৩-৮২) ব্যয় করতে হয়েছে এবং তিন সহস্রাধিক তথ্য উৎস ব্যবহার করতে হয়েছে। প্রায় ২০০ ব্যক্তির সাক্ষাৎকার ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতা গ্রহণ করতে হয়েছিল তাকে।
একুশে ফেব্রুয়ারিকে তিনি কেবল ভাষার আন্দোলন হিসেবে দেখেননি, বরং এটিকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের বিকাশের সংগ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, ১৯৪৮ এবং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন পূর্ব বাংলার রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি মৌলিক পরিবর্তন এনেছিল, যা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির গণবিরোধী চরিত্র সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তোলে। তাঁর মতে, ভাষা আন্দোলনই পাকিস্তানি নির্যাতনের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম ব্যাপক জাতীয় প্রতিরোধ। ভাষা আন্দোলনের ফলে বুর্জোয়া রাজনীতির সাম্প্রদায়িকতা ধর্মনিরপেক্ষতা লাভ করে এবং তা সামনে উঠে আসে।
রাজনৈতিক দর্শন ও চর্চা
১৯৬৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করে সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হন বদরুদ্দীন ওমর। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগের চার মাস পর পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিতে (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) যোগ দেওয়ার মাধ্যমে সাংগঠনিকভাবে শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের। নিপীড়িত মেহনতি মানুষের মুক্তির জন্য মাঠ পর্যায়ে করা শুরু করেন। মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যের কথা ভেবে দেশের প্রতিটি আনাচেকানাচে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন। সুনামগঞ্জ থেকে সাতক্ষীরা, ঠাকুরগাঁও থেকে টেকনাফ—সবখানেই গিয়েছেন তিনি। সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামই হয়ে উঠেছিল তার পরবর্তী জীবনের নতুন নেশা। বদরুদ্দীন উমর ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন। ২০০৩ সালে তিনি জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল নামে একটা সংগঠন গড়ে তোলেন এবং সভাপতির দায়িত্ব নেন। প্রায় ছয় দশক ধরে নানা প্রতিকূলতা ও বৈরিতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জীবনের শেষদিন পর্য ন্সতমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন মার্কসবাদী তাত্ত্বিক-বিশ্লেষক এবং সংগঠক হিসেবে।
আরও পড়ুন:
নির্বাচন নিয়ে কী ভাবছে এলডিপি?
পুরস্কার গ্রহণে অস্বীকৃতি
কাজের স্বীকৃতি হিসেবেবদরুদ্দীন উমরকে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তিনি কোনোটিই গ্রহণ করেননি। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করলেও সেটিও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। চলতি বছরের মার্চে স্বাধীনতা পুরস্কারের তালিকায় নাম ঘোষণা করলে এক বিবৃতিতে বদরুদ্দীন উমর বলেন, ‘১৯৭৩ সাল থেকে আমাকে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা থেকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। আমি সেগুলোর কোনোটি গ্রহণ করিনি। এখন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আমাকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা করেছে। এ জন্য তাদের ধন্যবাদ। কিন্তু তাদের দেওয়া এই পুরস্কারও আমার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।’
এর আগে ১৯৭২ সালে বদরুদ্দীন উমরকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেওয়া হয়, তবে তিনি তা তাৎক্ষণিক প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি ইতিহাস পরিষদের পুরস্কার পান এবং তা প্রত্যাখ্যান করেন।
যে কারণে কীর্তিমান
বদরুদ্দীন উমরের লেখা বইগুলোই তাকে অমর করে রাখবে।প্রায় ১২০টি বই তিনি লিখেছেন। এরমধ্যে ভাষা আন্দোলন নিয়ে পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ শীর্ষক গ্রন্থটি এক্ষেত্রে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তার আরও তিনটি বই ‘সাংস্কৃতিক সংকট’, ‘সাম্প্রদায়িকতা’ এবং ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’ -এই বইগুলো পাক-ভারত উপমহাদেশ বিশেষত: বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা বুঝতে পথিকৃৎ হিসেবে ভূমিকা রেখেছে বলে অনেকেই মনে করেন। এছাড়াও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক (১৯৭২), এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙালী সমাজ (১৯৭৩) বইগুলো পাঠকের স্বীকৃতি পেয়েছে।
বর্ণাঢ্য জীবন কাটিয়েছেন বদরুদ্দীন উমর। তার খ্যাতি ছিল দেশের বাইরেও। তিনি কলকাতা, ব্যাসেলস, হাইডেলবার্গ, বার্লিন বিশ্বদ্যিালয় এবং লন্ডন, অক্সফোর্ড, দিল্লি প্রভৃতি স্থানে বক্তৃতাও করেছেন।
শেষের কথা
বদরুদ্দীন উমর যে মানের লেখক ও গবেষক, দেশে তাকে সেই মর্যাদা দেওয়া হয়নি। হয়তো কমিউনিস্ট রাজনীতিক হওয়ায় এবং সব সরকারের বৈষম্যমূলক কর্মকাণ্ডের কট্টর সমালোচক হওয়ায় কখনো তাকে পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে বদরুদ্দীন উমরের নিজেরও আক্ষেপ আছে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলে গেছেন, ‘আমি একধরনের উপেক্ষিত। আমি যে এতো কাজ করেছি, আমাকে নিয়ে কোনো জায়গায় কোনো লেখা পাবেন না। এখানে এতো লোকের ওপর লেখা হয়, কিন্তু আমার লেখা নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না। এমনকি আমার ভাষা আন্দোলনের বইয়ের ওপরও কোনো আলোচনা নেই।’
এই উপেক্ষার কারণ নিজেই বিশ্লেষণ করে বদরুদ্দীন উমর বলেছেন, আমি যে একজন কমিউনিস্ট, সেটাই এখানকার লোকে জানে না। তারা আমাকে বুদ্ধিজীবী বলে। ভয় পায় এ কারণে যে আমি লোকের ভণ্ডামি, নির্বুদ্ধিতা, মূর্খতা, এসব প্রকাশ করি। আমি ঘটনা বিশ্লেষণ করি, ভুলত্রুটি নির্দেশ করি এবং অনেকের মুখোশ খুলে দিই। এটাই হচ্ছে আমার ওপর তাদের রাগের কারণ।