সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে গতি কম
ভাঙানোর প্রবণতা বেড়েছে
সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে আবার ভাটা পড়েছে। গত অক্টোবর থেকে কমেই চলেছে বিক্রি। একই সময়ে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর প্রবণতাও বেড়েছে। ফলে নিট বিক্রি (বিনিয়োগ) ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে নিট বিক্রি ঋণাত্মক হয়েছে ২ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সার্বিকভাবে সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে ভাঙানোর চাপ বেশি ছিল।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অনেকে সঞ্চয়পত্র ভেঙে সংসার চালাচ্ছেন। একই কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের সঞ্চয়প্রবণতা কমে গেছে। আবার আমানত ও সরকারের বিল-বন্ডের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিপর্যায়ের বিনিয়োগের একটি বড় অংশ ব্যাংক ও বিল-বন্ডে স্থানান্তর হয়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত সরকারের সুবিধাভোগী ধনী গোষ্ঠীর অনেকে আত্মগোপন করেছেন। এসব কারণে সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে। তবে জানুয়ারি থেকে সুদহার বাড়ানোর কারণে সামনে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বাড়ার আশা করছেন তারা।
উল্লেখ্য, সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি তথা বিনিয়োগ সরকারের ঋণ হিসেবে গণ্য হয়। এটা বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ব্যবহার করে সরকার। চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৩০ হাজার ১০৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ভাঙানোর পরিমাণ ছিল ৩২ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা। ফলে ৬ মাসে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়েছে প্রায় ২ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই সঞ্চয়পত্র বিক্রির গতি তুলনামূলক কম। প্রথম ৩ মাসে ভাঙানোর প্রবণতা কম থাকায় নিট বিনিয়োগ ইতিবাচক ধারায় ছিল। তবে পরের ৩ মাসে ভাঙানোর প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার কারণে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, সর্বশেষ ডিসেম্বর মাসে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। একই মাসে ভাঙানো হয়েছে ৮ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। ফলে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়েছে ৩ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। আগের মাস নভেম্বরে মোট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। ভাঙানোর পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। ওই মাসে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয় ৩ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। তার আগের মাস অক্টোবরে মোট বিক্রি হয় ৫ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা। ভাঙানোর পরিমাণ ছিল
আরও পড়ুন:
রাজধানীতে কিশোরীসহ ২ জনের মরদেহ উদ্ধার
৯ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। ওই মাসে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক ছিল ৩ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতে মোট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। ভাঙানোর পরিমাণ ২ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা। ওই মাসে নিট বিনিয়োগ আসে ২ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। আগস্টে বিক্রির পরিমাণ ৪ হাজার ১১২ কোটি টাকা। ভাঙানোর পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭৬ কোটি টাকা। নিট বিনিয়োগ ২ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর মাসে মোট বিক্রির পরিমাণ ৫ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা। ভাঙানোর পরিমাণ ১ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। নিট বিনিয়োগ ৪ হাজার ১০৯ কোটি টাকা, যা একক মাস হিসেবে শীর্ষে ছিল।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, মানুষের গড় আয় কমে গেছে। ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা যে পরিমাণ আয় রাখার কথা, তা রাখতে পারছে না। আরও অনেকে জমানো টাকা ভেঙে ফেলছেন, তাদের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর জন্য। অন্যদিকে সম্পদশালীদের মধ্যে যারা নামে-বেনামে একসময় সঞ্চয়পত্রে বিপুল বিনিয়োগ করতেন, তাদেরও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের আগ্রহ কমেছে। সব মিলিয়ে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
গত অর্থবছরের সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৮ হাজার কোটি টাকা। তবে বিক্রি ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকায় সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৭ হাজার ৩১০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু এই লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হয়নি। উল্টো পুরো অর্থবছরে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়েছিল প্রায় ২১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা।
আরও পড়ুন:
নির্বাচন নিয়ে কী ভাবছে এলডিপি?
কোন সঞ্চয়পত্রে কত মুনাফা বেড়েছে : সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড ও আমানতের সুদ বাড়ার কারণে গত জানুয়ারি থেকে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বাড়িয়েছে সরকার। এতদিন পরিবার সঞ্চয়পত্রে মেয়াদপূর্তিতে মুনাফার হার ছিল ১১.৫২ শতাংশ। এখন এই সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মুনাফার হার বাড়িয়ে করা হয়েছে সাড়ে ১২ শতাংশ। আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে এই মুনাফার ১২.৩৭ শতাংশ।
এখন থেকে পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফা মিলবে ১২.৫৫ শতাংশ। আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার হবে ১২.৩৭ শতাংশ। এত দিন এই সঞ্চয়পত্র কিনলে মেয়াদপূর্তিতে মুনাফার হার ছিল ১১.৭৬ শতাংশ। অন্যদিকে ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ পূর্তিতে আগে মুনাফার হার ছিল সর্বোচ্চ ১১.২৮ শতাংশ। জানুয়ারি থেকে এই সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মেয়াদপূর্তিতে মুনাফার হার হবে ১২.৪০ শতাংশ। আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার হবে ১২.৩৭ শতাংশ।
এ ছাড়া ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে এত দিন মেয়াদপূর্তির বছরে মুনাফার হার ছিল ১১.০৪ শতাংশ। এখন এই সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার হবে ১২.৩০ শতাংশ। আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই মুনাফার হার হবে ১২.২৫ শতাংশ। এর বাইরে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকে মেয়াদি হিসাবে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মুনাফার হার বাড়িয়ে করা হয়েছে ১২.৩০ শতাংশ। আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই হার ১২.২৫ শতাংশ।