নাগরিক ভোগান্তির অপর নাম সিরাজগঞ্জ পৌরসভা

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
১০ নভেম্বর ২০২৪, ১৯:৫৬
শেয়ার :
নাগরিক ভোগান্তির অপর নাম সিরাজগঞ্জ পৌরসভা

চলমান অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রজ্ঞাপনে দেশের সকল পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরদের পদ থেকে অপসারণ করার পর থেকেই পৌরসভার সেবা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ব্যতিক্রম নয় সিরাজগঞ্জের ৭ টি পৌরসভার নাগরিক সেবার সকল কার্যক্রমও। দিনের পর দিন পৌরসভায় ঘুরেও মিলছেনা কাঙ্খিত সেবা। এর ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছে পৌরসভার সাধারণ নাগরিকরা। তবে বর্তমান পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক ও সচিবরা বলছেন তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন কাজ চলমান রাখতে। 

জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ জেলা ৯ টি উপজেলা নিয়ে গঠিত হলেও এর মধ্যে ৭টি পৌরসভা কার্যক্রম রয়েছে। কিন্তু চলতি বছরের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের কারণে গত ৫ আগষ্ট আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর মেয়র ও কাউন্সিলররা হামলা মামলার ভয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। পরে বর্তমান অর্ন্তরবর্তীকালীন সরকার ২৬ সেপ্টেম্বর তাদের সকলকে পদ থেকে অপসারিত করলে স্থবির হয়ে পড়ে পৌরসভার নাগরিক সেবা কার্যক্রম। এতে নাগরিকরা কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছেননা তাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে। ফলে পৌরসভায় এসে ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম সনদ, মৃত্যুসনদ, নাগরিক সনদপত্র, ওয়ারিশ সার্টিফিকেট নিতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে ভুক্তভাগীদের অভিযোগ। 

অপরদিকে পৌরসভার স্থবির হয়ে পড়া কার্যক্রম সচল ও জনসেবা নিরবচ্ছিন্ন করতে প্রশাসক নিয়োগের পাশাপাশি একাধিক জেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োজিত করা হলেও তারা পৌরসভায় না আসাতে সেবা প্রদানে বিঘ্ন হচ্ছে। শুধু তাই নয়, নাগরিকরা এ সকল কর্মকর্তাদের অফিসে গেলেও মিলছে না কোনো সেবা। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ সকল সরকারি কর্মকর্তা সবাই অন্য জেলার। স্থানীয় কোনো নাগরিকের সঙ্গে চেনা বা পরিচয় না থাকার কারণেই এমন হচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থাকলে এমন ভোগান্তি হতোনা বলে সিরাজগঞ্জ পৌরসভায় সেবা নিতে আসা একাধিক নাগরিক মনে করেন। 

সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার ধানবান্ধি মহল্লার বাসিন্দা মীর রাশের কবির শান্ত জানান, আমি গত ৭দিন ধনে পৌরসভায় মৃত্যু সনদের জন্য ঘোরাঘুরি করছি। পৌরসভায় আসলে বলে ওই অফিসে যান। ওই কর্মকর্তা ওই ওয়ার্ডের দায়িত্বে আছেন। কিস্তু সেখানে গেলেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার পাওয়া গেলেও তিনি আমাকে না চেনার কারণে আবার পৌরসভায় ফেরত পাঠাচ্ছেন। এভাবে আমি শুধু পৌরসভায় আসছি আর যাচ্ছি। এতে করে সময় নষ্ট ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছেনা। এর দায় কে নিবে। কিন্ত পৌরসভায় যদি আজ জনপ্রতিনিধি থাকতো, তাহলে এমন ভোগান্তি হতোনা। 

মাজেদুল আলম নামে অপর এক পৌর নাগরিক অকপটে স্বীকার করে বলেন, ‘আমি নাগরিক সনদ ৭ দিনের মধ্যে পেলেও ওয়ারিশ সনদের কোন দিন পাবো এখন উপরওয়ালা ছাড়া আর কেউই বলতে পারবেনা।’

সমস্যার কথা স্বীকার করে দ্রুত এ সকল বিষয় সমাধানে নিরলস ভাবে কাজ করা হচ্ছে বলে জানান সিরাজগঞ্জ পৌরসভার সচিব মো: লুৎফর রহমান। তার মতে, ‘১৫টি ওয়ার্ডের ১৫জন পুরুষ এবং সংরক্ষিত ৫জনসহ মোট ২০জনপ্রতিনিধির কাজ পৌরসভার স্টাফদের করতে হচ্ছে। প্রশাসকের কাজ সহজ করতে ৮জন সরকারি কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের নিজেদের অফিসেও কাজ কম না। তাই সেবার গতি কমেছে এটা স্বীকার করতেই হবে। তবে দ্রুততার সঙ্গে সেবাদানের জন্য আমরা কাজ করছি।’

এছাড়াও তিনি অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলেন, ‘বর্তমানে পৌরসভার কোনো কর্মচারি-কর্মকতার নামে কোনো প্রকার অনিয়ন পরিলক্ষিত হলে তার বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার বর্তমান প্রশাসক মোফাজ্জল হোসেন (উপসচিব) বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে চেষ্টা করছি পৌরসভাকে শৃঙ্খলতায় আনতে। কিন্তু এত সমস্যা একটি পৌরসভায় থাকতে পারে এটি জানা ছিল না। তবে প্রতিনিয়ত সভা করে পৌর কর্মকর্তাদের দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালনের জন্য বলা হয়েছে।’

তবে, এরপরেও কাজের গতি বাড়ছেনা, এমনটি স্বীকার করেই তিনি বলেন, ‘নানাবিধ সমস্যা রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব না। তবে আমরা কাজ করছি এবং চেষ্টা করছি একটু বিলম্ব হলেও কাজে যেন কোনো ভুল না হয়। সঠিত এবং নির্ভুল কাজ করতে একটু সময় দিতেই হবে।’ তিনি এজন্য সিরাজগঞ্জ পৌরবাসিকে সার্বিক সহযোগিতা করারও অনুরোধ করেন।

অপরদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপসারিত একাধিক কাউন্সিলর জানান, তারা কোনো দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত কাউন্সিলর না হলেও তাদের ওপর এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া এক ধরনের বিমাতাসুলভ আচরনের সামিল। প্রায় ১৮ মাস সময় থাকতেই বর্তমান সরকারের এমন সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ নাগরিক আজ নানামুখি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তাদের মতে, অন্তত কাউন্সিলরদের স্ব-পদে বহালরাখা অথবা দ্রুত পুনরায় পৌরনির্বাচন দিয়ে পৌরবাসীর নাগরিক সেবা চালু করবে এই অন্তবর্তীকালীন সরকার।