কোনদিকে মোড় নিচ্ছে ভারত-কানাডা সম্পর্ক
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে কানাডায় খালিস্তান-বিরোধী অভিযানে ‘অনুমোদন’ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন দেশটি উপ-পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী ডেভিড মরিসন।কানাডার ‘সিভিল ডিফেন্স অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিটি’কে মরিসন জানিয়েছেন, ভারত সরকারের একজন প্রবীণ মন্ত্রী কানাডায় খালিস্তানপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযানের ‘অনুমোদন’ দিয়েছিলেন এবং সে বিষয়ে এক মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে তথ্য জানিয়েছিলেন তিনি। তার এই মন্তব্যের পর নতুন করে ভারদ-কানাডার কূটনৈতিক টানাপোড়েন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হরদীপ সিং নিজ্জরের হত্যা মামলাকে কেন্দ্র করে ভারত এবং কানাডার সম্পর্কের যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল গত বছর, সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও বেড়েছে। এই হত্যার পিছনে ভারতের হাত রয়েছে বলে আগেই অভিযোগ তুলেছিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। চলতি মাসেই একটা সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি হরদীপ সিং নিজ্জরের হত্যা মামলা ভারতের বিরুদ্ধে সহযোগিতা না করার অভিযোগও তুলেছিলেন। একইসঙ্গে দাবি করেছিলেন, এই মামলা সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তার এই দাবি নস্যাৎ করে দিয়ে সমস্ত অভিযোগ খারিজ করে দেয় ভারত।
কানাডার ‘সিভিল ডিফেন্স অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিটি’র (নাগরিক সুরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির) শুনানি ছিল মঙ্গলবার। ওই কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কনজারভেটিভ এমপি রাকেল ডানচো কানাডার নাগরিক ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করছিলেন। সেই সময়, ডেভিড মরিসনকে প্রশ্ন করা হয়, সম্প্রতি এক মার্কিন সংবাদমাধ্যমে কানাডায় খালিস্তান বিরোধী অভিযান সম্পর্কে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে সেখানে শাহ সম্পর্কে তিনি কোনও তথ্য দিয়েছিলেন কি না। শুনানি চলাকালীন বিষয়টা স্বীকার করে নেন মরিসন।
অমিত শাহ সম্পর্কে কানাডার এই অভিযোগের বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি ভারত সরকার। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, কানাডার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ভারত।
কানাডায় খালিস্তানপন্থী অভিযান এবং তার বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থান নিয়ে গত ১৪ অক্টোবর মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেখানে উচ্চপদস্থ কানাডিয়ান কর্মকর্তার বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছিল যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ অমিত শাহ খালিস্তানবিরোধী অভিযানের নেপথ্যে ছিলেন। শুধু তাই নয়, তার ‘অনুমোদনেই’ কানাডার মাটিতে খালিস্তান বিরোধী অভিযান চলেছে।
আরও পড়ুন:
রোগীর পেটে জীবন্ত মাছি!
এরপর প্রশ্ন উঠতে থাকে কানাডা সরকারের কোন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই বিষয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।
সিভিল ডিফেন্স অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিটির মঙ্গলবারের শুনানিতে এই প্রসঙ্গ উঠে আসে। কমিটির শুনানি চলাকালীন কনজারভেটিভ এমপি রাকেল ডানচো কানাডার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নাথালি ড্রুইনকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, শাহের বিষয়ে কোনও তথ্য কানাডার সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়নি বরং মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল- এই তথ্য সঠিক কি না। একই সঙ্গে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কানাডা সরকার গণমাধ্যমকে শাহের বিষয়ে কোনও তথ্য দিয়েছিল কি না।
শুনানির সময় কমিটিকে মিজ ড্রুইন জানান, এই তথ্য সঠিক যে বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তা মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছিল, কানাডিয়ান গণমাধ্যমে নয়। তবে কানাডা সরকারের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনও সাংবাদিককে কিছু জানানো হয়নি।
শুনানির পর ভারতের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসেনি। তবে 'ওয়াশিংটন পোস্ট'-এ নিজ্জরের হত্যা মামলা সংক্রান্ত খবর প্রথমবার প্রকাশিত হওয়ার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছিল। প্রতিবেদন সম্পর্কে একটি বিবৃতি জারি করে তারা বলেছে, “ওই প্রতিবেদনে একটা গুরুতর বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হয়েছে।”
আরও পড়ুন:
২৫ জিম্মিকে মুক্তি দিল হামাস
কানাডার অভিযোগের উত্তরে জানানো হয়েছিল, ‘সংগঠিত অপরাধ এবং সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্ক নিয়ে মার্কিন সরকারের তরফে উদ্বেগ প্রকাশের পরে, ভারত সরকার একটা উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে যা এই বিষয়ে তদন্ত করছে। অনুমানের উপর ভিত্তি করে দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দিয়ে কোনও লাভ হবে না।’
সম্প্রতি নিজ্জর হত্যা মামলায় ভারতীয় হাইকমিশনারের নাম উল্লেখ করার প্রসঙ্গে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভারতের পাল্টা অভিযোগ, পুরো বিষয়টি এখন রাজনীতির সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে, কারণ একাধিক ‘চ্যালেঞ্জের’ মুখে রয়েছেন ট্রুডো।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল “ভারত সরকার বরাবরই এ জাতীয় ভিত্তিহীন অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। কানাডার ট্রুডো সরকার ভোট পাওয়ার জন্য এসব করছে।”
প্রসঙ্গত, কানাডায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। কানাডার জনসংখ্যার ২ দশমিক ১ শতাংশ শিখ সম্প্রদায়ভুক্ত। গত ২০ বছরে কানাডায় শিখদের সংখ্যা বেড়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই শিক্ষা, ক্যারিয়ার, চাকরির মতো কারণে পাঞ্জাব থেকে কানাডায় পাড়ি দিয়েছেন।
আরও পড়ুন:
২৫ জিম্মিকে মুক্তি দিল হামাস