ভারতকে হারিয়ে আরও উজ্জীবিত হলো ফুটবল

জাহিদ রহমান
২০ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:৫৮
শেয়ার :
ভারতকে হারিয়ে আরও উজ্জীবিত হলো ফুটবল

এশিয়ান কাপ ফুটবলে ভারত ও বাংলাদেশ দুই দেশেরই খেলার সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু এর পরও পরশু গ্রুপ পর্বের খেলায় ভারত ও বাংলাদেশের ম্যাচ ঘিরে নতুন এক উত্তাপ ও উন্মাদনা সূচিত হয়। এই উত্তাপ-উন্মাদনার পটভূমি তৈরি হয় মূলত প্রবাসী বাংলাদেশি ফুটবলার, এই সময়ের সেরা আইকন হামজা চৌধুরী ও শমিত সোমদের ঘিরে। যে বাংলাদেশের ফুটবল বহুদিন ধরে ছিল রঙহীন, ম্যাড়মেড়ে সেই ফুটবলে অদম্য এক প্রাণস্পন্দন তৈরি করেছেন হামজা চৌধুরীরা। কয়েক মাস ধরে তাই বাংলাদেশের খেলায় আসে নতুন এক ছন্দ। সব নাজুক অবস্থা পেরিয়ে উজ্জীবিত ফুটবলের ছোঁয়া দেখা পাওয়া যায় সর্বত্র। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ ২২ বছর পর বাংলাদেশ ভারতকে ১-০ গোলে পরাজিত করে বিগত দিনের ফুটবল অনুশোচনার কিছুটা হলেও প্রায়শ্চিত্ত করতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশের এ বিজয় ফুটবলের দ্বিতীয় জীবন দিয়েছে বললে ভুল হবে না। কেননা বিগত দিনে অনেক স্বপ্ন এই ভারতের কাছেই চুরমার হয়ে যায়। সেই ভারতকে পর পর দুই ম্যাচে রুখে দেওয়া এবং পরাজিত করা চাট্টিখানা কথা নয়। দেশের ফুটবল ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে বুঝবেন এটা অনেকটা স্বপ্নের মতো বিষয়। বিগত দিনে ভারতের ফুটবল দল বরাবরই বাংলাদেশের ওপর প্রভাব-প্রতিপত্তি বজায় রেখেছে। সেই বিদেশ বসু, প্রসূন ব্যানার্জি থেকে শুরু করে আইএম বিজয়ন, সাব্বির আলী, বাইচুং ভুটিয়া, সুনীল ছেত্রীরা বারবার বাংলাদেশের স্বপ্ন ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেছেন। পরিসংখ্যান বলছে, সর্বশেষ লড়াইয়ের আগে বাংলাদেশ ও ভারত ফুটবলে এ পর্যন্ত মোট ২৯ বার মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ভারত ১৩ ম্যাচে জয়লাভ করে, ১৩ ম্যাচ ড্র হয়। আর বাংলাদেশ মাত্র ৩টি ম্যাচে জয়লাভ করতে সমর্থ হয়।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশ প্রথম ভারতের মুখোমুখি হয় ১৯৭৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে। সেই ম্যাচে বাংলাদেশ ০-৩ গোলের ব্যবধানে পরাজিত হয়। ভারতের পক্ষে গোল করেন বিদেশ বসু, হারজিন্দর সিং ও জাভিয়ের পিয়াস। এরপর ১৯৮২ সালে দিল্লি এশিয়ান গেমসে দুই দল দ্বিতীয়বারের মতো মুখোমুখি হয়। ১৯৮২ সালের ২০ নভেম্বর গ্রুপ পর্যায়ের ম্যাচে বাংলাদেশ ০-২ গোলে পরাজিত হয়। জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে ভারতের পক্ষে দুটি গোল করেন স্ট্রাইকার প্রসূন ব্যানার্জী। এরপর ১৯৮৫ সালে ৩০ মার্চ ও ১২ এপ্রিল ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের দুটি ম্যাচেই বাংলাদেশ পরাজিত হয় ২-১ গোলের ব্যবধানে। তবে একই বছরের ২৫ ডিসেম্বর সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন গেমসে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ম্যাচ ড্র করতে সমর্থ হয়। এরপর অবশ্য পর পর তিনটি ম্যাচ ড্র করে বাংলাদেশ। ম্যাচগুলো ছিল এএফসি এশিয়ান কাপ এবং সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন গেমসে।

বাংলাদেশ ফুটবল দল ভারতের বিপক্ষে প্রথম জয় লাভ করে ’৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর কলম্বোতে অনুষ্ঠিত সাফ গেমসের লড়াইয়ে। বাংলাদেশ ২-১ গোলে ভারতকে পরাজিত করে। এরপর বাংলাদেশকে দ্বিতীয় জয়ের জন্য আট বছর অপেক্ষা করতে হয়। ’৯৯ সালের ২ অক্টোবর কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত সাফ গেমসের লড়াইয়ে শাহাজউদ্দিন টিপুর গোলে ১-০ ব্যবধানে ফের জয়ের দেখা মেলে। এরপর এএফসি এশিয়ান কাপ, গোল্ডেন জুবিলি টুর্নামেন্ট, প্রীতি ম্যাচ, এশিয়ান গেমস, সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ, নেহেরু কাপ, ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ বাছাই পর্বে মোট ১৫ বার বাংলাদেশ ফুটবল দল ভারতের মুখোমুখি হলেও জয়লাভ করতে পারেনি। এই ১৫ ম্যাচের মধ্যে ৯টিতে বাংলাদেশ পরাজিত হয়। বাকি ম্যাচগুলো ড্র হয়।

’৯৯ সালের পর ২০০৩ সালের ১৮ জানুয়ারি সাফ গোল্ডকাপের সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে সর্বশেষ জিতেছিল বাংলাদেশ। এই ম্যাচে মতিউর মুন্নার দেওয়া ‘গোল্ডেন গোলে’ জয়লাভ করেছিল বাংলাদেশ। এর আগে ৭৭ মিনিটে কাঞ্চনের দেওয়া গোলে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও ৮১ মিনিটে ভারতের পক্ষে ডি কুনহা গোল পরিশোধ করেন। শেষে এই ম্যাচের সমাপ্তি ঘটে গোল্ডেন গোলে। মতিউর মুন্না সাডেন ডেথে গোল করে বাংলাদেশকে ফাইনালে নিয়ে যান। এটিই ছিল বাংলাদেশের শেষ জয়। এরপর বাংলাদেশ আর জয় দেখেনি। টানা ২২ বছর তাই বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরশু ১৮ নভেম্বর ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ে ফুটবলের নতুন এক অধ্যায় রচিত হয়েছে বললে ভুল হবে না।

ইংল্যান্ড থেকে আসা ফুটবল সেলিব্রিটি হামজা চৌধুরী এবং আরও কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি ফুটবলার যুক্ত হওয়ার পর দেশের ফুটবলে যেমন নতুন জাগরণ তৈরি হয়েছে, তেমনি ফুটবল নিয়ে সবার মাঝে নতুন এক আগ্রহও তৈরি হয়েছে। এ বছরের ২৫ মার্চ শিলংয়ে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে গোলশূন্যভাবে ম্যাচ ড্র করে। সে ম্যাচেই অভিষেক হয় আলোচিত হামজা চৌধুরীর। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে তিনি দেশের মাটিতে ভুটানের বিপক্ষে প্রথম গোল করেন। এ কথা সত্য, লাল-সবুজ জার্সি গায়ে দিয়ে হামজা চৌধুরীরা সত্যিই দেশের ফুটবলে এক নবজাগরণের সূচনা করেছেন। সেই নবজাগরণের স্রোতধারায় পরশু দেশের মাটিতে শক্তিশালী ভারতকে ১-০ গোলে পরাজিত করার অদম্য এক সক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন দেশের ফুটবলাররা। তাদের কারণেই ভারতের সঙ্গে ম্যাচে গ্যালারি ছিল দর্শকে পরিপূর্ণ। ফুটবলের সেই সোনালি দিনের আবহে উৎসবে পরিণত হয়েছিল পুরো গ্যালারি। দেশের ফুটবলের যারা চুলচেরা খবর রাখেন, তারা সবাই-ই জানেন দক্ষিণ এশীয় ফুটবলে বাংলাদেশ ও ভারত বরাবরই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে দুই দেশের লড়াই নিয়ে সবার আগ্রহ থাকত। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ত সর্বত্র। কিন্তু ফুটবল মাঠে ভারতের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে বারবারই বিপর্যস্ত হতে হয়েছে বাংলাদেশকে। জয়ের কাছাকাছি গিয়ে হেরে যাওয়া, খেলার শেষ সময়ে কাউন্টার অ্যাটাকে গোল খাওয়া- এ সবই ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বহুবার তাই ফুটবলামোদীদের ভীষণরকম মন খারাপ হয়েছে। হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়েছে।

কিন্তু সেই মন খারাপ করা চিত্রের প্রতিচিত্র এবার নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। ফিফা র‌্যাংকিংয়ে ভারতের অবস্থান এখন ১৩৬, অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৩। কিন্তু এতে কিছু যায় আসে না। শুধু ভারত বলে নয় বাংলাদেশ দল সম্প্রতি সিঙ্গাপুর, হংকংয়ের সঙ্গেও ভালো খেলেছে। অনেক অনেক দিন পর প্রমাণিত হয়েছে, সময়ের ধারায় অন্য এক বাংলাদেশ ফিরে এসেছে ফুটবলে। সেই বাংলাদেশ এখন খেলতে জানে, লড়তে জানে। ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশের ফুটবলে আরও যে নতুন উদ্দীপনা শুরু হলো তা ধরে রাখাটাই হবে ফুটবলকুশলীদের মূল কাজ। কোথায় কীভাবে বিনিয়োগ করতে হবে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সে পথেই এগোতে হবে। প্রয়োজনে বিভিন্ন দেশ থেকে আরও হামজা চৌধুরীকেও নিয়ে আসতে হবে।

জাহিদ রহমান : ক্রীড়ালেখক ও গবেষক

মতামত লেখকের নিজস্ব