শেয়ার বাজারে ফের সক্রিয় কারসাজি চক্র

নিজস্ব প্রতিবেদক
২০ অক্টোবর ২০২৫, ১৯:৫৯
শেয়ার :
শেয়ার বাজারে ফের সক্রিয় কারসাজি চক্র

নানা উদ্যোগ গ্রহণ করার পর শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরছে না। মাঝে মধ্যে বাজারে একটু ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার দেখা মিললেও পরক্ষণেই আবার দরপতন হচ্ছে। ফলে বড় লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। সমস্যা কাটতে না কাটতেই হাজির হচ্ছে আরেক সমস্যা, যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হয় দরপতন।

বেশ কয়েকদিনের পতনের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে দেশের পুঁজিবাজারে সোমবার (২০ অক্টোবর) সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসে বড় উত্থান হয়েছে। এদিন প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দরপতনের তুলনায় প্রায় ছয়গুণ বেশি সংখ্যক শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে। এতে এক্সচেঞ্জটির সবগুলো মূল্যসূচক প্রায় দেড় শতাংশ বা তার বেশি বেড়েছে। তবে গত কয়েকদিনের ধারাবাহিকতায় আজও বাজারে বিক্রির আদেশের তুলনায় ক্রয় আদেশ কম ছিল। এতে ডিএসইর সার্বিক লেনদেন আরও কমে প্রায় ৪ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন হয়েছে।

এর আগে, দীর্ঘ পতন শেষে গত জুন থেকে শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ শেষ না হতেই আবার পতনের ধারায় ফিরে যায়। তাই সোমবার সূচকের এই উত্থানের স্থায়ীত্ব কতো দিন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, পুঁজিবাজারে কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন গুজব ঘুরপাক খাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মার্জিন ঋণ বিধিমালায় বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ না দেখার গুজব। কিছু অসাধু ব্যক্তি ও ব্রোকারেজ হাউস নিজেদের স্বার্থে মার্জিন ঋণ নিয়ে এ ধরনের আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। এতে আতঙ্কিত বিনিয়োগকারী প্যানিক সেল দিচ্ছে, যা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ ছাড়া পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ, কয়েকটি ব্যাংক বর্হিভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধের সিদ্ধান্ত এবং সাম্প্রতিক সময়ের জুন ক্লোজিং কোম্পানিগুলোর খারাপ পারফরম্যান্সের কারণও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

গত এক বছরে সরকারের সদিচ্ছা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) উদ্যোগে পুঁজিবাজার থেকে হারানো আস্থা ফিরতে শুরু করেছিল। বাজারে নতুন পুরাতন বিনিয়োগকারীদের বিচরণ বাড়ছিল। বাড়তে শুরু করছিল লেনদেন ও শেয়ারদর। কিন্তু এই ধারাকে ব্যাহত করতে সক্রিয় হয়ে ওঠে একটি চক্র। পাশাপাশি ডিএসইর অযাচিত হস্তক্ষেপে ও নানা ইস্যুতে আবারও গতি হারাচ্ছে পুঁজিবাজার। 

মুলত চাঙা পুঁজিবাজার হঠাৎ দরপতনের পেছনে প্রধানত চারটি কারণ বিদ্যমান বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে: এর মধ্যে প্রথমত ডিএসই অযাচিত হস্তক্ষেপ, মার্জিন ঋণ ও এনবিআরের সাম্প্রতিক চিঠি এবং শেয়ারের দাম বাড়লেই ডিএসই নোটিশ ইস্যুতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

পুঁজিবাজারের বর্তমানের স্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ফের সক্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেছে বিগত আওয়ামী সরকারের আমালের শেয়ার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতরা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি খাত ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ছিলেন ১৯৯৬ ও ২০১১ সালের শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির প্রধান হোতা। তিনি শেয়ারবাজারের সাবেক চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন ও শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একটি সিন্ডিকেট। পুঁজিবাজার থেকে এই সিন্ডিকেট আত্মসাৎ করে ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আর্থিক খাতের ‘দরবেশ’ খ্যাত সালমান আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে। দেশের শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রণে নিতে তিনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনকে ব্যবহার করেছেন। তার প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে আবদুর রউফ। প্রাক্তন আওয়ামী নেতা ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ডা. ইকবালের ঘনিষ্ঠ এই ব্যক্তি বিগত সরকারের আমলে সালমান এফ রহমানের সঙ্গে মিলে পুঁজিবাজারের কৃত্রিম ওঠানামা ঘটিয়ে শত শত কোটি টাকা লোপাট করেছেন। িসম্প্রতি আাইসিবি ক্যাপিটেল ম্যানেজমেন্টের সিনিয়র নির্বাহী কর্মকর্তা আবু ডালিম মোঃ ফজলুল্লাহর বিরুদ্ধে শেয়ার বাজার কারসাজির অভিয়োগ ওঠেছে। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের মদদপুস্ট এই ব্যক্তি পুজিঁবাজার লুন্ঠনের জন্য একটি চক্র গড়ে তুলেছে বলে লিখিতভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে অভিযোগ এসেছে। এই চক্রে আরও যুক্ত রয়েছেন- বেক্সিমকোর কামরুজ্জামান ( মারকেট গ্যাম্বলার), আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী সাজেদা চৌধুরীর ভাতিজা ব্রোকার হাউজ মালিক শাকিল রিজভী, সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী ডা. দিপু মনির খালাতো ভাই, বি এল আই সিকুউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন, ট্রেড ক্যাপ সিকিউরিটিজের পরিচালক আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম , স্কাই লাইন সিকুউরিটিজের মালিক সাইদুর রহমান, গ্যাম্বলার মিজান, ফাষ্ট সিকুউরিটি ইসলামি মার্চেন্ট ব্যাংকের সিওও রানা, সিপ্যাল হোটেলের এমডি আমিনুল হক শামীম, ইউনাইটেড ফাইন্যান্সিলেয় সিকিউরিটির এসোসিয়েট ডিরেক্টর ফরিদ আহমেদসহ আরও কয়েকজন। অভিযোগ আছে তাদের সহযোগিতা করছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের রেগুলারিটির কমকর্তা মোহাম্মদ বজলুর রহমান, মনিটরিং ম্যানেজার মোহাম্মদ ইকরাম হোসেন, সিনিয়র এক্সকিউটিভ মোহাম্মদ জাকির হোসেনসহ আরও কয়েকজন। এদের তৎপরতায় দুর্বল অনেক প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দিচ্ছে বিএসইসি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা কারসাজিকারীদের এসব কোম্পানির শেয়ারের দামে কারসাজির 'অনুমতি' দিয়েছে যাতে শেয়ারের দাম বেড়ে যায় ও আইপিও অনুমোদনের যৌক্তিকতা পায়।

পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে বিনিয়োগকারীদের আশার পালে হাওয়া লাগার আগেই আবারও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই কারসাজি চক্র। তাদের উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ডে শেয়ারবাজার একদিকে যেমন তারল্য হারাচ্ছে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরা আস্থা সংকটে ভুগছেন।

বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই চিহ্নিত কারসাজি চক্র প্রতিনিয়ত শেয়ারবাজারে সক্রিয় রয়েছে। নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য তারা কম দরে শেয়ার কেনার উদ্দেশ্যে গুজব ছড়ায় এবং পরবর্তীতে কৃত্রিমভাবে বাজার উত্থান ঘটিয়ে টার্গেটকৃত লাভ তুলে নেয়। এই চক্রের অপতৎপরতার কারণে বাজার তার স্বাভাবিক গতিপথ হারাচ্ছে এবং চরম অস্থিতিশীলতার মুখে পড়ছে। বাজারের এই কৃত্রিম উত্থান-পতন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে তারল্য সংকটে ভুগছে।